গ্যাস, বুকজ্বলা, বদহজম বা কোষ্ঠকাঠিন্য—এই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয় অনেকেই। অনেক সময় মনে হয়, এই সমস্যাগুলো শুধুই অতিরিক্ত খাওয়া, ফাস্টফুড বা মশলাদার খাবারের কারণে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, শুধু খাদ্যাভ্যাসের ভুল নয়, মানসিক চাপও হজমের সমস্যা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০১৩ সালে “হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং”-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলে আমাদের পরিপাকতন্ত্রে। মস্তিষ্ক যখন উদ্বিগ্ন থাকে, তখন তা পাকস্থলী ও অন্ত্রে সংকেত পাঠায়। এর ফলে বুক জ্বলা, গ্যাস, খিদে না থাকা, হজমে অসুবিধা এবং এমনকি বমিভাব দেখা দিতে পারে।
আরও সাম্প্রতিক ২০১৯ সালের একটি সমীক্ষা “পাবমেড”-এ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে যে উদ্বেগ বা মানসিক চাপ আইবিএস (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম), পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং অল্প খেয়ে তাড়াতাড়ি অতিরিক্ত হজমজনিত সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে হজমের জন্য ক্ষতিকর, কারণ এটি হজমে জড়তা, অ্যাসিডিটি এবং খাদ্য উপাদান শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে।
হজম ঠিক রাখার উপায়
১. নিয়মিত শরীরচর্চা ও যোগব্যায়াম:
শরীরচর্চা শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে না, এটি মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। যোগাসন ও ধ্যানের মাধ্যমে স্ট্রেস হরমোন কোরটিসল নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে।
২. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:
ভাজা, তেলযুক্ত বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। পরিবর্তে ফাইবারসমৃদ্ধ সবজি, ফলমূল ও ভিটামিনযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া দরকার। প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ টকদই, দই বা কিমচি হজমের প্রাকৃতিক সহায়ক।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান:
প্রতিদিন অন্তত ৩ লিটার পানি পান করা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ। পানি হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে এবং পেটের সুস্থ ব্যাকটেরিয়াকে সহায়তা করে।
৪. যথেষ্ট ঘুম:
৭–৮ ঘণ্টা ঘুম হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। ঘুম না হলে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ঘুম কম হলে পাকস্থলী সংক্রান্ত সমস্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৫. শ্বাস-প্রশ্বাস ও ধ্যান:
নিয়মিত শ্বাসের ব্যায়াম, প্রণায়াম বা মেডিটেশন মানসিক চাপ কমায়। শ্বাসের মাধ্যমে রক্তে অক্সিজেন বৃদ্ধি পায়, যা পাকস্থলী ও অন্ত্রকে সচল রাখে।
৬. মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখা:
হজমের সমস্যার মূল চাবিকাঠি হলো মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা। উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে হজমের বিভিন্ন অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা সামাজিক চাপ মোকাবিলায় ধ্যান, যোগব্যায়াম ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি।
৭. ছোট ছোট খাবার:
একবারে অতিরিক্ত খাওয়ার পরিবর্তে দিনে ৪–৫ বার ছোট খাবার খাওয়া ভালো। এতে পাকস্থলী হজমের কাজ সঠিকভাবে করতে পারে এবং গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা কমে।
৮. ফাস্টফুড ও চিনি কমানো:
বাজারজাত ও অতিমিষ্ট খাবার হজমে জটিলতা সৃষ্টি করে। এমন খাবার হজম হতে বেশি সময় নেয় এবং গ্যাসের সমস্যা বাড়ায়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, হজমের সমস্যার জন্য সাধারণত খাবার খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক চাপকেও প্রধান কারণ হিসেবে ধরতে হবে। তাই শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন নয়, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণেও জোর দেওয়া দরকার।
শেষে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, নিয়মিত ব্যায়াম, যোগাসন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমালে হজমের সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। শরীরের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াই সুস্থ হজমের মূল চাবিকাঠি।









