ইরানের বিরুদ্ধে ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভিযান শুরুর আগে মার্কিন গোয়েন্দা, সামরিক ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে একাধিক সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাদের আশঙ্কা ছিল, সামরিক সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং ইরানে আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে। তবে এসব সতর্কতা উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত অভিযানের পথে এগিয়ে যান ট্রাম্প।
মঙ্গলবার প্রকাশিত দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ওভাল অফিসে তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডকে ডেকে পাঠান। ইরানে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন জানতে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে গ্যাবার্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হলে তার জায়গায় আরও কট্টরপন্থি একটি নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে। সেই নতুন নেতৃত্ব পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে আরও আগ্রহী হতে পারে বলেও গোয়েন্দা মূল্যায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।
গ্যাবার্ডের আশঙ্কা ছিল, হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী ও তাদের মিত্রদের ওপর ইরানি হামলার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে দেশটির প্রতিশ্রুতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি জানান।
তবে ট্রাম্পের একজন জ্যেষ্ঠ সহযোগী এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। তাদের মতে, ইরান তখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ছিল। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় আঘাত হানা এবং একই সঙ্গে ট্রাম্পের নিজের ‘শান্তিদূত’ হিসেবে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করার জন্য সেটি ছিল বিরল সুযোগ।
অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুদ্ধের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, কূটনৈতিক সমঝোতার খরচ ও ঝুঁকি এমন একটি যুদ্ধের তুলনায় কম, যার পরিণতি শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সামরিক কর্মকর্তারাও ট্রাম্পকে হামলার বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য ‘নির্ণায়ক’ হামলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তবে একই সময়ে সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদের মজুত এবং অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা বাহিনীকে নিয়ে কিছু কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব আশঙ্কাকে গুরুত্ব না দিয়ে ট্রাম্প মনে করেছিলেন, প্রয়োজন হলে সামরিক বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। শেষ পর্যন্ত তিনি ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন।
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প অভিযানের ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার খবর মার-এ-লাগোতে একটি তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে তিনি গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন।
কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়ে অচলাবস্থার দিকে এগোলে সৌদি আরব ও কাতারের নেতারা হোয়াইট হাউসকে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য চাপ দিতে থাকেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতেও যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ে। জরিপে প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি চুক্তির পক্ষে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর জুনে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন ট্রাম্প। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ক্ষতি করতে পারে—এমন সতর্কবার্তাও দলের কয়েকজন সদস্য তাঁকে দিয়েছিলেন।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা গত ১৭ আগস্ট কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে ফেরে।
এর অংশ হিসেবে ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এই অভিযানের আওতায় ইরানের অর্থনৈতিক ও আর্থিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি দেশটির ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে দুর্বল করাই এর অন্যতম লক্ষ্য বলে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে।









