আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফের) সঙ্গে ঋণচুক্তির মাধ্যমে দেশের জনগণকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা না থাকায় পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার এমন শর্তে রাজি হয়েছিল।
শনিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, সরকারের নীতি হলো আইএমএফ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে সম্মান করা। তবে দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু থাকলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।
আইএমএফের শর্ত প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, “তারা বলেছে, তাদের শর্ত পরিবর্তন করা যাবে, কিন্তু আমরা কোনো শর্ত পরিবর্তন করতে পারব না।”
তিনি বলেন, “আমরা ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি পেয়েছি। এখন যদি বলা হয় কর-জিডিপি অনুপাত ৯.২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, আমি কি তা পারব?”
তিনি আরও বলেন, “তারা (আইএমএফ) টার্নওভার ট্যাক্স আরোপ করতে বলে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী যদি এটা চান, তাহলে আমরা তা করব।”
আইএমএফের আর্টিকেল-৪ সব দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভর্তুকি কমানোর বিষয়টিও সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত, কিন্তু তা হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এসডিআর পুনর্বিন্যাসের পক্ষে।
তিনি বলেন, “ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় তেল-গ্যাসের দাম না বাড়লেও আওয়ামী লীগ সরকার ঘন ঘন বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এখন তেলের দাম সমন্বয় করা হলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। ডিজেলে ভর্তুকি বেশি থাকায় এর দাম বাড়ালে সেচ মৌসুমে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি।”
তিনি বলেন, “আইএমএফের হিসাবেই গত তিন বছরে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। এখন দারিদ্র্য কমাতে কৃষক কার্ড চালু করছি, তখন তারা বলছে সরাসরি ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। এই দ্বিচারিতা চলতে পারে না।”
সেমিনারের গেস্ট অব অনার, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত বাস্তবায়নে জটিলতার কারণে ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা বাজারে নেতিবাচক সংকেত দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দেশে বৈষম্য বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে চায়, তা যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। গত তিন বছরে ঋণের সুদ পরিশোধে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যাতে ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সেজন্য রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে।
শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৫ শতাংশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৩ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে এই তিন খাতে সম্মিলিতভাবে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ কোথা থেকে আসবে, তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে।
ব্যাংকিং খাত ঠিক না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “১৩–১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীকে কত মুনাফা করতে হবে?”
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, দারিদ্র্যের হার নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ধাপে ধাপে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
তিনি জানান, জ্বালানি ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন কৌশলগত পণ্যের মজুদ নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার।
ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, সরকার নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে।
বন্ধ ও রুগ্ন কারখানা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বড় প্রণোদনা প্যাকেজ দেবে বলে জানান তিনি। এটি রিফাইন্যান্সিং স্কিম, ক্রেডিট গ্যারান্টি বা অন্য কোনো ব্যবস্থার আওতায় হতে পারে।
ব্যাংক রেগুলেশন বিলে পুরোনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কেউ চাইলে এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে যেতে পারে।
বিদেশি ক্রেতারা যাতে তৈরি পোশাকের ন্যায্য মূল্য দেয়, সে জন্য বায়ার্স কনফারেন্স আয়োজন করলে সরকার সমর্থন দেবে বলেও জানান তিনি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যেসব গার্মেন্টস মালিক নিজ কারখানায় রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাদের জন্য বিজিএমইএর সব সেবা ফি মওকুফ করা হবে।
তিনি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেই বিদ্যুৎ শিল্পখাতে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি মার্চেন্ট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট নীতিমালা চূড়ান্ত করার আহ্বান জানান।
বিলুপ্ত ঘোষিত পাঁচটি ব্যাংকে গার্মেন্টস মালিকদের অর্থ আটকে থাকায় অনেক কারখানা রুগ্ন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি এবং দ্রুত তা ফেরতের দাবি জানান।
এছাড়া ম্যান-মেড ফাইবারের কাঁচামাল উৎপাদনে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ জরুরি।
ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় এবং সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. রফিকুল ইসলাম।









