✒️ আবদুল্লাহ আলমামুন আশরাফী
দৃষ্টিনন্দন ফুলরমজানুল মোবারক ও কোরআন মাজিদ একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেন এক বৃন্তে দুটো দৃষ্টিনন্দন ফুল। ভাবতেই হৃদয়ে শিহরণ জাগে। ভালো লাগার স্নিগ্ধ সমীরণ বয়ে যায় অন্তর্জগতে। রমজানের সৌন্দর্যকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে কোরআন। কোরআন মুমিনহৃদয়ের অনির্বচনীয় প্রশান্তির নাম। কোরআনের স্পর্শ ছাড়া মানব জনম অর্থহীন। কোরআনের স্পর্শে মৃতপ্রায় হৃদয় সজীব হয়ে ওঠে।
আর রমজানে কোরআনের স্পর্শে মুমিনের অন্তর উদ্বেলিত হয়। হৃদয়ে নামে হিদায়াতের বসন্ত। আর সে বসন্ত পূর্ণতা পায় তারাবির সালাতে পবিত্র কোরআন মাজিদের তিলাওয়াতে। রমজানুল মোবারকের সুন্দর এই সময়ে আমরা কোরআন মাজিদ নিয়ে মৌলিক কিছু কথা উপস্থাপনের প্রয়াস পাব ইনশাল্লাহ।
কোরআনের পরিচয় কোরআনের ভাষায়
কোরআন নিজেই নিজের পরিচয় পেশ করেছে। নিজের পরিচয় উল্লেখ করতে গিয়ে কোরআন বলে, ‘নিশ্চয় এটা সম্মানিত কোরআন, যা আছে এক সংরক্ষিত কিতাবে, যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না’ (সুরাতুল ওয়াকিয়া : ৭৭, ৭৮, ৭৯)।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘বরং এটা সম্মানিত কোরআন। লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ’ (সুরাতুল বুরুজ : ২১, ২২)।
কোরআন নির্দিষ্ট কোনো গোত্র, সম্প্রদায় বা দলকে সঠিক পথ দেখায়, এমন না। বরং কোরআন কিয়ামতের আগপর্যন্ত আগত প্রতিটি মানুষকেই সফলতার বিমল পথে অগ্রগামী হওয়ার নির্দেশনা দেয়। ইরশাদ হয়েছে ‘রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যে কোরআন মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী’ (সুরাতুল বাকারা : ১৮৫)।
কোরআন সরল সঠিক পথ দেখায়। কোরআন এর পথ প্রদর্শনে কোনো ভুল নেই। ইরশাদ হয়েছে, ‘এই কোরআন এমন পথপ্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনদের সুসংবাদ দেয় যে তাদের জন্য মহা পুরস্কার রয়েছে’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৯)।
কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো রজ্জু বা রশি। এই রশি যারাই মজবুতভাবে ধরে রাখবে তারাই সফলতার পথে অগ্রগামী হতে পারবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো। কখনো বিচ্ছিন্ন হইও না’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইমাদুদ্দীন আবুল ফিদা ইসমাইল ইবনে উমর ইবনে কাসির (রহ.) তাঁর তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হজরত আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, ‘কিতাবুল্লাহ তথা কোরআন হচ্ছে আকাশ থেকে জমিনে পাঠানো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রজ্জু বা রশি।’
এমনিভাবে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এই কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো সুদৃঢ় রশি। এটি একটি বিমল আলোকরেখা। একটি উপকারী প্রতিষেধক। যারা এই কোরআনকে আঁকড়ে ধরবে তারা সব বিভ্রান্তি পথভ্রষ্টতা থেকে বেঁচে থাকবে।
যারা কোরআনের নির্দেশনা মেনে চলবে তারা চিরকালীন (জাহান্নাম থেকে) মুক্তি লাভ করবে’ (তাফসিরুল কোরআনিল আজিম ১/৪৭৮ দারুল হাদিস কায়রো মিসরের সংস্করণ)। কোরআন কিয়ামতের ময়দানে তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে। যেদিন ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনও তাকে দেখে পলায়ন করবে।
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা কোরআন পাঠে আত্মনিয়োগ কর। কারণ কোরআন কিয়ামতের কঠিন মুহূর্তে তার পাঠকের জন্য আল্লাহতায়ালার কাছে সুপারিশ করবে’ (সহিহ মুসলিম-১৭৫৯)।
হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) কোরআন সুপারিশকারী। আর তাঁর সুপারিশ কবুল করা হবে। যে কোরআনকে তার সামনে রাখবে অর্থাৎ কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়বে কোরআন তাকে পথ দেখিয়ে দেখিয়ে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। আর যে কোরআনকে উপেক্ষা করে পেছনে রাখবে কোরআন তাকে হাঁকিয়ে হাঁকিয়ে জাহান্নামে পৌঁছে দেবে (সহিহ ইবনে হিব্বান-১২৪)।
সারকথা কোরআন মানবজাতির সফলতার মৌলিক পাথেয়। হাজার বছর ধরে কোরআন অসংখ্য বনি আদমকে সঠিক পথের দিশা দিয়ে যাচ্ছে। তাই আসুন, আমরাও কোরআনের স্নিগ্ধ আলোয় নিজেদের জীবনকে আলোকিত করি। কোরআনের আলোকে ছড়িয়ে দিই যুগ থেকে যুগান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী, গাজীপুর









