বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। এই ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতার বহু আগ থেকেই অন্যায়, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শিখেছে। স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়েই সেই সংগ্রামের শেষ হয়নি; বরং স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খেয়েছে, বারবার থমকে গেছে রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা। স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদের কালো থাবা বারবার দেশের ভাগ্যাকাশে নেমে এসেছে, গণতন্ত্র ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
তবে ইতিহাসের প্রতিটি সংকটময় অধ্যায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, যখনই বিপদ ঘনীভূত হয়েছে, তখনই একটি রাজনৈতিক দল এ দেশের মানুষের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই দলটি রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, জেল-জুলুম সহ্য করেছে, কিন্তু আপস করেনি। সেই দলটির নাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি।
বিএনপি কখনোই কেবল আন্দোলনের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি রাজপথে নেমেছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কারাবন্দি থেকেছেন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বছরের পর বছর প্রবাসে থাকতে হয়েছে। আর দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে প্রাণ দিতে হয়েছে ঘাতকের বুলেটে বিদ্ধ হয়ে। এই আত্মত্যাগই বিএনপির রাজনীতিকে আলাদা করে চিহ্নিত করে।
বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্য। রাজপথে সংগ্রামের পাশাপাশি বিএনপি সবসময় রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের কথা ভেবেছে। ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো কীভাবে পুনর্গঠন করা যায়, এই প্রশ্নে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহু আগ থেকেই কাজ করে আসছেন। তিনি জানতেন, ফ্যাসিবাদ চিরস্থায়ী নয়; একদিন এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটবে, আর তখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব বিএনপিকেই নিতে হবে।
এই দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তার ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতির সামনে উপস্থাপন করেন ‘ভিশন-২০৩০’। ২০২২ সালে তারেক রহমান দেন ২৭ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং ২০২৩ সালে সব দল, মত ও পথের গণতন্ত্রকামী শক্তিকে একত্র করে প্রকাশ করেন রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা। এটিই প্রমাণ করে বিএনপি কেবল ক্ষমতার রাজনীতি নয়, রাষ্ট্রগঠনের রাজনীতি করে।
আজ বাস্তবতা হলো, আগামী নির্বাচনের জন্য বিএনপিই সবচেয়ে প্রস্তুত রাজনৈতিক দল। কারণ বিএনপিরই রয়েছে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ, সুস্পষ্ট ও নীতিনির্ভর পরিকল্পনা। এটি বিএনপির রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সহিষ্ণুতা ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার বহিঃপ্রকাশ। তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও দক্ষতা তাঁকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তিনিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি কার্যকর প্যারাডাইম শিফট-এর বাস্তব উদাহরণ।
সম্প্রতি তারেক রহমান যে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ প্রকাশ করেছেন, তা এই পরিবর্তিত রাজনীতিরই প্রতিফলন। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ এবং পরিবারের নারী সদস্যদের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত। এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমপরিমাণ চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ৫০ লাখ পরিবার এই সহায়তার আওতায় আসবে।
ফার্মার্স কার্ড কোনো সাধারণ কার্ড নয়; এটি কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডাটাভিত্তিক করার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। কৃষকের জমির তথ্য, চাষাবাদ, বর্গা বা লিজ, ফসল উৎপাদন, সফল আবাদ, সেচ, সার-বীজ, কীটনাশক সবকিছু এক ছাতার নিচে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক পাবেন; পাবেন সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা ও কৃষিঋণ। কৃষিযন্ত্রপাতি ক্রয়, সময়মতো সেচ সুবিধা, ফসলের ন্যায্যমূল্য, আবহাওয়া ও জলবায়ুর তথ্য, কৃষি বিমা, প্রশিক্ষণ এবং ফসলের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবাও এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সারাদেশে ঘুরে প্রায় ১,৮০০ খাল খনন ও সংস্কার করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান পুনরায় খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছেন, যা কৃষি, পরিবেশ ও জলব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি বর্তমানে বাংলাদেশের একটি বড় সংকট। তারেক রহমান দেশের সব নাগরিকের জন্য ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এই খাতে দুর্নীতি দূরীকরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তারেক রহমানের লক্ষ্য স্পষ্ট মানুষ যেন চিকিৎসার খরচে সর্বস্বান্ত না হয় এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা যেন মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে।
শিক্ষা খাতে তারেক রহমানের ভাবনা গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তিনি বারবার বলেছেন, একটি জাতি গড়ে তুলতে শিক্ষিত মায়ের কোনো বিকল্প নেই। নারী শিক্ষায় বিএনপির ঐতিহাসিক অবদান রয়েছে। অথচ গত ১৬ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। এই সংকট কাটাতে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ, কারিগরি শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ‘মিড ডে মিল’, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি খেলাধুলাকে শখ নয়, সম্মানজনক পেশা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে বিএনপি।
পরিবেশ ও জলসম্পদ রক্ষায় তারেক রহমানের পরিকল্পনা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সারাদেশে অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন-পুনঃখনন, তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনা পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলবে। পাশাপাশি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও জৈবসার উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ধর্মীয় সেবাখাতে তারেক রহমানের পরিকল্পনা মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের মাসিক সম্মানী, উৎসব ভাতা, প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। ১৯৯৩ সালে বিএনপি প্রবর্তিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম সারাদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের জন্যও সমান সম্মানী ও সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে।
কর্মসংস্থান তারেক রহমানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার সেন্টার, এসএমই ও স্টার্ট-আপ সহায়তা, আইটি শিল্প সম্প্রসারণ, ই-কমার্স হাব, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড গড়ে তোলার পরিকল্পনা তারই প্রমাণ।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই আদর্শকে সামনে রেখে তারেক রহমান যে রাষ্ট্রগঠনের রূপরেখা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। এই দেশ গড়ার সংগ্রামে তারেক রহমান ও বিএনপিকে সমর্থন দেওয়াই আজ সময়ের দাবি।
লেখকঃ মাহবুব নাহিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক









