ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদ কীভাবে বণ্টন হবে, কোন উত্তরাধিকারী কোন অংশটি পাবেন, অথবা ব্যক্তিগত কোনো ইচ্ছা বা সামাজিক দায়িত্ব কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এসব বিষয় নিশ্চিত করার জন্য অসিয়ত বা উইল তৈরি করা এখন দেশে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। আইনজীবীরা বলছেন, জীবদ্দশায় বৈধভাবে একটি অসিয়তনামা তৈরি করে রাখা ভবিষ্যৎ জটিলতা, পারিবারিক বিরোধ এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে পারে।
অসিয়ত তৈরিতে প্রথমেই প্রয়োজন পরিষ্কার মনোভাব ও আইনি কাঠামো সম্পর্কে ধারণা। সাধারণভাবে, উইল তৈরির জন্য ব্যক্তিকে সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হয় এবং চাপ বা প্রভাবমুক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়। অসিয়তনামা হাতে লেখা বা টাইপ করা—যেকোনোভাবে হতে পারে; তবে নথিটি স্পষ্ট, নির্ভুল ও আইনি ভাষায় হওয়াই উত্তম।
অসিয়তের মূল কাঠামোতে থাকে—উইলদাতার পরিচয়, সম্পদের বিবরণ, প্রতিটি সম্পদের অধিকার কার কাছে যাবে তা নির্দিষ্ট উল্লেখ এবং প্রয়োজনে নির্বাহী (এক্সিকিউটর) নিয়োগের বিষয়টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অসিয়ত করলেও সম্পদের বিবরণ যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে না লিখে বাদ-বাকি রাখেন। এতে পরবর্তীতে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং উত্তরাধিকারীরা আইনি জটিলতায় পড়েন।
বাংলাদেশের আইনে মুসলিম উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রে শারীয়াহ অনুযায়ী সম্পদ বণ্টনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে; তবে উইলদাতা চাইলে সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাউকে দিতে পারেন। এজন্য পারিবারিক আলাপ-আলোচনা ও আইনি পরামর্শকে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। অন্যদিকে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের জন্য আলাদা উত্তরাধিকার আইন বা সিভিল কাঠামো প্রযোজ্য হয়, যা উইলে স্পষ্ট উল্লেখ থাকা দরকার।
অসিয়তনামার শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে দুইজন সাক্ষীর স্বাক্ষর রাখা বাধ্যতামূলক এবং তাদের অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে। আইনজীবীরা পরামর্শ দেন, নথিটি একটি নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা এবং অন্তত একজন বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিকে নথির অবস্থান জানিয়ে রাখা উচিত। অনেকে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে উইলটি সত্যায়িত করে নেন, যা পরবর্তীতে গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ায়।
সম্প্রতি শহুরে পরিবারে অসিয়ত তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক কাঠামো ছোট হওয়া, বিদেশে বসবাস, সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি এবং জটিল উত্তরাধিকার মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মামলা দেশের দেওয়ানি মামলার উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে।
আইনজীবীরা বলছেন, “অসিয়ত কোনো বিতর্ক তৈরি নয়, বরং ভবিষ্যৎকে সুসংগঠিত করার দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। পরিবারকে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব থেকে দূরে রাখা এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার জন্য আইনি পরামর্শ নিয়ে অসিয়তনামা তৈরি করা জরুরি।”
অনেকেই মনে করেন, মৃত্যুর পরের পরিকল্পনা সাধারণত মানসিকভাবে কঠিন একটি বিষয়; কিন্তু বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি পরিবারে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর পথ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য দিয়ে প্রস্তুত করা একটি অসিয়তনামাই পারে মূল্যবান সম্পদ ও সম্পর্ককে ভবিষ্যৎ জটিলতা থেকে রক্ষা করতে।









