ইরানের রাজনৈতিক আকাশে এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর দেশটির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আকস্মিক মৃত্যুর পর তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে এখন একটাই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি আর কেউ নন, খামেনির দ্বিতীয় পুত্র ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি। গত কয়েক দশক ধরে পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্রপরিচালনার কলকাঠি নাড়া এই নিভৃতচারী ব্যক্তিই এখন ৪৭ বছরের পুরনো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের হাল ধরতে যাচ্ছেন বলে জোরালো গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে, তার সরাসরি আঘাত লেগেছে খামেনি পরিবারের ওপর। গত শনিবার তেহরানে খামেনির বাসভবনে চালানো এক ভয়াবহ হামলায় মোজতবা খামেনির মা, স্ত্রী এবং এক বোন প্রাণ হারিয়েছেন। সেই সময় ভাগ্যক্রমে অন্য স্থানে উপস্থিত থাকায় মোজতবা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। শোকের এই আবহ আর যুদ্ধকালীন চরম অস্থিরতার মধ্যেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবার টিকে থাকা এবং তার সম্ভাব্য ক্ষমতায় আরোহণ ইরানের ভবিষ্যৎ রণকৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তার প্রচারবিমুখতা। ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব কারণ দেশজুড়ে তার ব্যাপক প্রভাব থাকলেও অনেকেই আজ পর্যন্ত তার কণ্ঠস্বর শোনেননি। তিনি কখনোই কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি কিংবা জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে কোনো জ্বালাময়ী বক্তৃতা বা ধর্মীয় ভাষণ দেননি। অথচ তাকেই বিবেচনা করা হয় ইরানের শাসনব্যবস্থার ‘নিউক্লিয়াস’ বা ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে, যার রয়েছে দেশটির প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর সঙ্গে অত্যন্ত গভীর ও কৌশলগত সম্পর্ক।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় আসা মানেই হলো ইরানের প্রশাসনে কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতা বা আলোচনার পথ তার শাসনামলে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নিলে তা কেবল একটি পারিবারিক উত্তরাধিকার হবে না বরং একে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আধিপত্য বজায় রাখার এক কঠোর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে। তবে এই উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার মধ্যে এক বিশাল সাংবিধানিক ও নৈতিক বিতর্কও লুকিয়ে রয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো। এখন যদি খামেনির পর তার ছেলে সরাসরি ক্ষমতায় বসেন, তবে সমালোচকরা একে ‘ধর্মীয় রাজবংশ’ হিসেবে চিহ্নিত করবেন যা পাহলভি আমলের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সংস্কারপন্থীরা আগে থেকেই তার বিরুদ্ধে রাজবংশতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তুলে আসছেন। এছাড়া ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্টের সময় বাসিজ আধাসামরিক বাহিনী ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের নেপথ্যেও মোজতবার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোজতবার অতীত ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন তাত্ত্বিক নেতা নন বরং রণক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি আইআরজিসি-র ‘হাবিব ব্যাটালিয়ন’-এ সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময়ের তার অনেক সহযোদ্ধা বর্তমানে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ পদে আসীন রয়েছেন, যা মোজতবাকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত করেছে। এর পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে একটি বিশাল গোপন অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পরিচালনারও অভিযোগ রয়েছে যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ইরানের কঠোর আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে কোনো ব্যক্তিকে ‘আয়াতুল্লাহ’ পদমর্যাদার হতে হয়, যেখানে মোজতবা বর্তমানে একজন মধ্যম সারির আলেম বা ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’। তবে এই বাধা অতিক্রম করা অসম্ভব নয় কারণ ১৯৮৯ সালে তার বাবা যখন দায়িত্ব নেন, তখন তিনিও আয়াতুল্লাহ ছিলেন না এবং তার জন্য সংবিধানে বিশেষ সংশোধনী আনা হয়েছিল। বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে মোজতবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইনি পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারে দেশটির নীতি-নির্ধারণী পর্যদ।
সুত্রঃবিডি-প্রতিদিন








