হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং ইরানের চলমান যুদ্ধ কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতিতে চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আগামী মে মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে এই নতুন সংকট দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে এই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে যে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়েছে তাকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দীর্ঘ সাত সপ্তাহের নীরবতা ভেঙে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হচ্ছে। চীনের জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ এই রুট দিয়ে আসায় বেইজিং এই অবরোধকে তাদের সরাসরি স্বার্থে আঘাত হিসেবে দেখছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে নিজস্বভাবে ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনী যদি এই অবরোধ লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলো আটকাতে শুরু করে তবে চীনের সাথে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সম্প্রতি ‘রিচ স্টারি’ নামক একটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হওয়ার ঘটনাটি এই উত্তেজনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন বেইজিং যদি মনে করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের আড়ালে ইচ্ছাকৃতভাবে চীনের ব্যবসায়িক ও জ্বালানি স্বার্থের ক্ষতি করছে তবে তারা এর কঠিন জবাব দিতে দ্বিধা করবে না।
চীনের জাতীয়তাবাদী গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সাবেক সম্পাদক হু শিজিন এক ব্লগ পোস্টে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, আমেরিকার কাছে হারানোর চেয়ে চীনের হাতে খেলার মতো তাসের সংখ্যা অনেক বেশি। যদি ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখে তবে চীন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিরল খনিজ পদার্থ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। উল্লেখ্য যে আমেরিকার অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ চুম্বকের প্রায় ৯০ শতাংশই বেইজিং নিয়ন্ত্রণ করে যা মার্কিন অর্থনীতির চাকা স্থবির করে দিতে সক্ষম।
এদিকে, বেইজিং সফরের প্রস্তুতি নিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন যে চীনের প্রেসিডেন্ট তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাবেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান ইস্যুতে শি জিনপিংয়ের সাথে তার পত্র বিনিময় হয়েছে যেখানে চীনা পক্ষ তেহরানকে অস্ত্র সরবরাহের খবর অস্বীকার করেছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকেই অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চীনকে অনির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর সমালোচনা করছেন।
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি প্রতিবেদন, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে চীন গোপনে ইরানকে গুপ্তচর স্যাটেলাইট সরবরাহ করেছে যা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার সক্ষমতা বাড়াবে। ট্রাম্প ইতিপূর্বে হুমকি দিয়েছিলেন যে তেহরানকে যারা অস্ত্র দেবে তাদের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং সামরিক উত্তেজনার এক অদ্ভুত দোলাচলে আটকে গেছে দুই দেশের পূর্বনির্ধারিত শীর্ষ সম্মেলনটি যার ভাগ্য এখন ঝুলছে হরমোজ প্রণালীর পরিস্থিতির ওপর।
অন্যদিকে, চীন বর্তমানে বেইজিংয়ে একের পর এক বিশ্বনেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজেকে বিশ্ব শান্তির ও স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ রাশিয়া ও ভিয়েতনামের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে শি জিনপিং বোঝাতে চাইছেন যে আমেরিকা যেখানে যুদ্ধ উসকে দিচ্ছে চীন সেখানে কূটনীতিতে মনোযোগী। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোও মালাক্কা প্রণালীর গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রভাবের সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন যা বেইজিংয়ের অবস্থানকে আরও শক্ত করছে।
রেমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াং ইওয়েই’র মতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে জয়ী হয়ে বীরের বেশে চীন সফরে আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি তার বিপরীত। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার দায় এড়াতে ওয়াশিংটন এখন বেইজিংয়ের ওপর দোষ চাপাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। মে মাসের নির্ধারিত সফরের আগে হরমুজ প্রণালির এই যুদ্ধ যদি থামানো না যায় তবে ট্রাম্পের বেইজিং সফর শেষ পর্যন্ত এক বড় ধরণের কূটনৈতিক পরাজয়ে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
স্টেইটসটাইমসের বিশ্লেষণ








