কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বৌলাই পাটধা এলাকার কথিত পীর শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমি দখল, প্রতারণা, মাদ্রাসায় আর্থিক অনিয়ম, সুদে অর্থ লেনদেন, চেক জালিয়াতি, ভুয়া পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখানো এবং বাবার কবরকে মাজার বানিয়ে অর্থ সংগ্রহসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে। পরিবার, শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা এসব অভিযোগ এনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–০১–এ ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে মামলা (মামলা নং: ২০৯/২৫) দায়ের হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
মামলার বাদি মহিব্বুল্লাহ অভিযোগ করেন, তাঁদের পিতা আবু বকর ছিদ্দিকের মৃত্যুর আট বছর পার হয়ে গেলেও বড় ভাই শফিকুল পৈত্রিক সম্পত্তি হিস্যানুযায়ী ভাগ করে না দিয়ে একাই জোরপূর্বক ভোগ-দখল করছে। পারিবারিক বৈঠক, সালিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেও তিনি বারবার সময়ক্ষেপণ করেন। অভিযোগকারীরা জানান, জমি বুঝিয়ে দিতে মাঠে গেলে শফিকুলের অনুসারীরা বাধা সৃষ্টি করেন এবং ছোট ভাই–বোনদের ভয়ভীতি দেখান। এতে পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা ও আতঙ্কে রয়েছে।
ভুক্তভোগী বোনেরা বলেন, বাবার অজানা ‘ঋণের কথা’ দেখিয়ে শফিকুল প্রথমে তাঁদের কাছ থেকে ‘২ শতাংশ জমি’ নেওয়ার কথা বলেন। পরে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে জোরপূর্বক ৬ শতাংশ করে জমি লিখে নেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। তাঁদের অভিযোগ—“আমরা ভাই বলেই বিশ্বাস করেছিলাম। পরে দেখি প্রতারিত হয়েছি।”
এর আগে সরেজমিনে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, কয়েক বছর আগে শফিকুল নিজের বাবার কক্ষে ভুয়া ‘পুলিশ’ ও ‘সাংবাদিক’ সাজিয়ে কয়েকজনকে পাঠান। তারা বাবাকে ও এক নারী মুরিদকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। ঘটনার পর বাবার কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়, যার বড় অংশ শফিকুল আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি পরে অনুতপ্ত হয়ে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।
শফিকুল পাটধা দারুল হুদা আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি নিয়ে গুরুতর অনিয়ম করেছেন বলে একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, নিয়োগপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া, এমপিওভুক্ত পুরোনো শিক্ষকদের বঞ্চিত করা, এবং সাদা চেক ও হ্যান্ডনোটে স্বাক্ষর নিয়ে বেতন–ভাতার বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছিল। এই অভিযোগে তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে লিখিত আবেদন দিয়েছিলেন। কয়েকজন শিক্ষক বলেন, “সুপারের অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললেই মাদ্রাসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেত।”
এ ছাড়া কথিত পীর শফিকুলের বিরুদ্ধে সুদের কারবার পরিচালনা, সুদাসলের টাকা পরিশোধ করার পরও ফাঁকা চেকে ইচ্ছামতো টাকা বসিয়ে মামলা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নানশ্রী ও বৌলাই এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তিন ও পাঁচ লক্ষ টাকা সুদে নেওয়ার পর পুরো অর্থ পরিশোধ করেও তাঁদের নামে বিশাল অঙ্কের জালিয়াতি মামলা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তাঁরা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো—পিতা আবু বকর ছিদ্দিক মৃত্যুর আগে স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছিলেন, যেন তাঁর কবরকে মাজারে পরিণত করা না হয়। কিন্তু পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে শফিকুল কবরের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করে দান–নাজিরের নামে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করছেন। স্থানীয় ধর্মীয় আলেম ও দরবারের গদীনশীন ব্যক্তিরা এসব কর্মকাণ্ডকে “বেদআত” ও “মরহুমের মর্যাদা হানিকর” বলে মন্তব্য করেছেন।
মামলার বাদী মহিব্বুল্লাহ বলেন, “শফিকুল দীর্ঘদিন ধরে পরিবারকে প্রতারণা করছে। সম্পত্তি জোর করে দখল করে রেখেছে। মাদ্রাসার টাকা আত্মসাৎ করেছে। সুদের নামে মানুষের জীবন নষ্ট করছে। বাবার কবরকে ব্যবসার জায়গা বানিয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।” তিনি আরও বলেন, পরিবার, শিক্ষক, কর্মচারী ও গ্রামবাসী মিলেও তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে, কারণ শফিকুলের কিছু উশৃঙ্খল অনুসারী সবসময় ভয়ভীতি দেখান।
অন্যদিকে শফিকুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলোতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।









