► প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠক ► বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ গঠন
বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ সুদহার বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মন্তব্য করেছেন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, ম্যান-মেইড ফাইবার থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত প্রায় সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এসব উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ব্যবসায়ীদের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে প্রস্তাবনায় অন্যান্য দেশের প্রমাণভিত্তিক আইনগত, নীতিগত এবং নিয়ন্ত্রক দৃষ্টান্ত অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এসিআই পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আরিফ দৌলা, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী, বে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান, ইনসেপ্টা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুকতাদির, ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল জাব্বার, র্যাংগস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী এবং প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর।
এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুকতাদির, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিন এবং বিডা চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরেন। ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ব্যাংকিং খাতকে আরও উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে দেশীয় কোম্পানিগুলো নিজেদের আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বিদেশ থেকে সহজে ঋণ নিতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় বন্ড বাজার পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেন তারা। ডিজিটাল ব্যাংক চালুর মাধ্যমে লেনদেনের জটিলতা কমিয়ে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা জোরদারেরও সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে অকার্যকর রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বেসরকারিকরণ পুনরুজ্জীবিত করা এবং ব্যাংকিং ও বিমা খাতে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। রপ্তানি খাত প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে নতুন খাত বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, আউটডোর সরঞ্জাম এবং বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতসহ বিভিন্ন খাতে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর খাতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেমনটি দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাণ শিল্প বা তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে দেখা গেছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি ‘গ্লোবাল বিউটি কনটেস্ট’-এর অংশ, যেখানে বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ টানতে প্রতিযোগিতা করছে। তাই শুধু সস্তা শ্রম বা বড় বাজার নয়, বরং প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনার খরচ, নীতিমালা ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের সঙ্গে তুলনা করে উন্নয়ন করার সুপারিশ করা হয়।
লজিস্টিক খাতের দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে জিডিপির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ লজিস্টিক খাতে ব্যয় করে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে বন্দর, বিমানবন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ঢাকার বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর ব্যবস্থার সংস্কারের ওপরও জোর দেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, বর্তমান করব্যবস্থা জটিল ও অদক্ষ এবং এতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার বাইরে নতুন সুবিধা চালু, অগ্রিম আয়কর বাতিল এবং উৎসে কর পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়। বৈঠকে জাতীয় রপ্তানি কৌশল প্রণয়ন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি অর্জনের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ব্যবসায়ীদের নানান সংকটের কথা বিগত দিনে আমরা শুনে এসেছি, প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের মুখ থেকে তাদের সমস্যার কথা শুনতে চেয়েছিলেন। তাদের কথাগুলোর একটা নোট নেওয়া হয়েছে। অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে, অনেক পেন্ডিং আছে, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।
এ বিষয়ে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় জোরদার করে দেশের উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করা, যেখানে দেশের সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা যাবে এবং দোষারোপ না করে যৌথভাবে সমাধানের পথ খোঁজা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিয়েছেন এবং নিজেই এই বৈঠকের আয়োজন করেছেন। এজন্য আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’ আগামী ৯০ দিনের মধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে, যার মাধ্যমে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ শুরু করা হবে। নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘সরকার যখন বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য নেয়, তখন সিদ্ধান্ত আরও কার্যকর হয়। আমরা ব্যবসায়ী সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তথ্যভিত্তিক ও সুপরিকল্পিত প্রস্তাব উপস্থাপন করব।’ এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
✒️ শাহেদ আলী ইরশাদ









