► সীমান্ত পেরিয়ে আসছে দূষিত বাতাস ► সবচেয়ে দূষিত বগুড়া ► ভালো বাতাস যশোরে
✒️শামীম আহমেদ
দূষিত বায়ুর শহরের তকমা বহু বছর ধরেই লেগে আছে রাজধানী ঢাকার নামের সঙ্গে। ২০২৫ সালেও বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত বাতাসের রাজধানীর খেতাব পেয়েছে এই মহানগরী। ৯ হাজার ৪৪৬টি শহরের মধ্যে দূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল ৩২তম। তবে বায়ুদূষণে অনেকটা নীরবে ঢাকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে দেশের বেশ কিছু শহর। আন্তর্জাতিক নজরদারির বাইরে থাকায় এগুলোর খবর সামনে আসছে না। এর কিছু ঢাকার আশপাশেই, কিছু উত্তরবঙ্গ বা সীমান্ত এলাকায়।
সাম্প্রতিক পরিবেশ অধিদপ্তর বায়ুমান পরীক্ষা কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রসারণ করায় বিষয়টি সামনে আসতে শুরু করেছে। গত ২ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, রাজশাহী, সাভার, ময়মনসিংহ, বগুড়া, টঙ্গী অধিকাংশ দিনই বায়ুদূষণে ঢাকাকে পেছনে ফেলেছে। এই সাত দিনের গড় হিসাবে বায়ুমান সূচকে (একিউআই) ঢাকার স্কোর ছিল ১৫৩.৭১। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের ১৫৫.৮৬, সাভারের ১৫৫.৭১, ময়মনসিংহের ১৬১.২৮ ও টঙ্গীর ১৬৩.১৪। রাজশাহীর ছয় দিনের গড় স্কোর ছিল ১৫৬। ৮ এপ্রিল বৃষ্টি হওয়ায় ওইদিন দূষণ কমে স্কোর ৮৫-তে নামে। ফলে সাত দিনের গড় স্কোর দাঁড়ায় ১৪৬। অধিদপ্তর থেকে দুই দিনের তথ্য প্রকাশ না করায় গাজীপুরের পাঁচ দিনের গড় স্কোর ছিল ১৫৩.২ ও বগুড়ার ১৭৪.৬। সেই হিসেবে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে দূষিত শহর বগুড়া। আর বায়ুমান সূচক ১০১ থেকে ১৫০ এর মধ্যে থাকলে তা স্পর্শকারত জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর ও ১৫০ পার হলে তা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত দেশের ২৬টি এলাকার বাতাসের তথ্য প্রকাশ করছে। এর মধ্যে একই জেলার মধ্যে একাধিক এলাকার তথ্যও রয়েছে। এ ছাড়া অনেক এলাকার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে না। যেমন, ২ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল- এই সাত দিনে সিলেটের বাতাসের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে মাত্র দুই দিন। নারায়ণগঞ্জ অন্যতম দূষিত এলাকা হলেও শহরটির বায়ুমানের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। বায়ুমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুমান পরীক্ষা কার্যক্রমের অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। সারা দেশে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসত। একই সঙ্গে বায়ুদূষণের কারণগুলো চিহ্নিত করা সহজ হতো। দূষণের কারণে ওই এলাকাগুলোতে কী কী স্বাস্থ্যগত সমস্যা হচ্ছে তা জানা যেত। এতে দূষণ কমানো ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হতো। গবেষকরা বলছেন, ভারত ও মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা দূষিত বাতাসও বাংলাদেশের বাতাসের মান খারাপ করছে। এ কারণে কলকারখানা না থাকলেও উত্তরবঙ্গে ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় বায়ুদূষণ বেশি। অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলে দূষণ কম। পরিবেশক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা- এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড স্যোশাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা এসডোর চালানো এক গবেষণায় আন্তসীমান্ত দূষণের বিষয়টি উঠে আসে। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারের মতে, বাংলাদেশের বায়ুদূষণের ৩০-৩৫% কারণ হলো আন্তসীমান্ত দূষণ। অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর ভারতের খড় পোড়ানো এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষিত বাতাস, মঙ্গোলিয়া ও ইরান থেকে আসা ধূলিকণা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পরিস্থিতি শোচনীয় করে তোলে। এটি ঢাকার বায়ুমানও মারাত্মকভাবে খারাপ করে তোলে। আন্তসীমান্ত দূষণ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের ভিতরেও ধুলো নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে ভালো বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে যশোরের বাসিন্দারা। বায়ুমান সূচকে সেখানকার সাত দিনের গড় স্কোর ৭৮.১৪। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যকর না হলেও পুরোপুরি অস্বাস্থ্যকর নয়। এ ছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দূষণ স্কোর ৯১, কক্সবাজারের ৯১, বরিশালের ৯১.৪৩, খুলনার ৯৫.৮৩। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দূষিত দেশের তালিকায় শীর্ষে ছিল পাকিস্তান। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালেও দেশ হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। ২০২৩ সালে বায়ুদূষণে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশের নাম।









