মুদ্রানীতি, প্রযুক্তি, আচরণগত অর্থনীতি ও উন্নয়ন অর্থনীতি—এবারের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে এসব বিষয়ের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সোমবার এ পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার মৌসুমের সমাপ্তি ঘটবে।
সুইডেনের স্টকহোমে স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ০৯টা ৪৫ মিনিট) বিজয়ী বা বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। এর তিন দিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
গত বছর প্রযুক্তি কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চালিত করে এবং প্রভাবিত করে, সে বিষয়ে গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জোয়েল মোকির, ফ্রান্সের ফিলিপ আগিয়োঁ এবং কানাডার পিটার হাউইট অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান।
এ কারণে এ বছর একই ক্ষেত্রের গবেষণার জন্য আবারও পুরস্কার দেওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন এএফপির সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞরা।
স্টকহোম থেকে এএফপি জানায়, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের অর্থনীতির অধ্যাপক রিচার্ড টল এএফপিকে বলেন, ‘নোবেল কমিটির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে স্পষ্টতই দর-কষাকষি চলে– ‘এ বছর আমি আপনার প্রার্থীকে সমর্থন করব, যদি আগামী বছর আপনি আমার প্রার্থীকে সমর্থন করেন।’
টলের মতে, কমিটি এ বছর আচরণগত অর্থনীতির পথিকৃৎ এবং মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণাকারী যুক্তরাষ্ট্রের কলিন ক্যামেরার ও জর্জ লোয়েনস্টেইনকে পুরস্কার দেওয়ার ‘ইঙ্গিত’ দিচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে ম্যাট রবিনও পুরস্কার পেতে পারেন।
গবেষণাপত্রে বহুল উদ্ধৃতির ভিত্তিতে সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের পূর্বাভাস দেওয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্ল্যারিভেটের ডেভিড পেন্ডলবারি বলেন, মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে মাইকেল উডফোর্ডও একজন ‘শক্তিশালী প্রার্থী’।
পেন্ডলবারি বলেন, ‘এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রটি দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি পায়নি।’
অতীতের বিজয়ীদের দিকে তাকালেও দেখা যায়, নোবেল কমিটি সাধারণত গবেষণা প্রকাশের প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর পর সেটিকে স্বীকৃতি দেয়। উডফোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি ছিল ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি বই।
সামাজিক ইস্যু
গবেষণা প্রকাশের পর পুরস্কার পেতে দীর্ঘ সময় লাগার একটি কারণ হলো, এর মাধ্যমে নোবেল কমিটি গবেষণাটির দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব ও স্থায়িত্ব মূল্যায়নের সুযোগ পায়।
তবে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্টেন পেডারসেন বলেন, নোবেল কমিটির সদস্যরা ‘আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে কী ঘটছে, সেদিকেও নজর রাখেন এবং কান পাতেন’।
তিনি আরও বলেন, ‘সমাজের যেসব বড় প্রশ্ন নিয়ে আমরা ভাবি, সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু রাজনৈতিক বা সমসাময়িক প্রবণতাও দেখা যায়।’
পেডারসেন সম্ভাব্য বিজয়ীদের নিয়ে অনুমান করতে না চাইলেও টল বলেন, কমিটি যদি ‘রাজনৈতিক বার্তা দিতে’ চায়, তাহলে সরকারে লবিং ও দুর্নীতি নিয়ে কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান ক্রুগার এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ জগদীশ ভগবতীকে পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।
টলের মতে, উন্নয়ন অর্থনীতির ক্ষেত্রে আরেকটি সম্ভাব্য দল হলেন যুক্তরাজ্যের টিম বেসলি, ইতালির গুইদো তাবেলিনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডেইড্রে ম্যাকক্লস্কি।
টলের তৈরি একটি মডেল অনুযায়ী, আরও চারটি ক্ষেত্র থেকে এবার পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।
এর একটি হলো তথ্য ও নেটওয়ার্ক। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্যানফোর্ড গ্রসম্যান ও ম্যাথিউ জ্যাকসন পুরস্কার পেতে পারেন।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট ব্যারো ও ডেভিড ওয়েইল এবং ফ্রান্সের জিল সাঁ-পল।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও পুরস্কারের সম্ভাব্য ক্ষেত্র। এ বিষয়ে স্বীকৃতি পেতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের জিন গ্রসম্যান ও মার্ক মেলিৎজ এবং ইসরাইলের এলহানান হেল্পম্যান।
সবশেষে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি আইকেনগ্রিন ও কেন রোগফের সঙ্গে কারমেন রেইনহার্ট পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন।
আরও নারীকে পুরস্কার দেওয়ার প্রত্যাশা
সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৬ সালে মারা যান। তাঁর উইলে প্রতিষ্ঠিত মূল পাঁচটি পুরস্কারের মধ্যে অর্থনীতির পুরস্কারটি ছিল না।
এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরস্কার’। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুদানে ১৯৬৮ সালে এটি চালু হয়। এ কারণে সমালোচকেরা একে ‘ভুয়া নোবেল’ বলেও অভিহিত করেন।
এ পর্যন্ত অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ৯৯ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন নারী। তাঁদের সবাইকে ২০০০ সালের পর পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
পেডারসেন বলেন, ‘স্পষ্টতই এবং যথার্থ কারণেই আরও বেশি নারী পুরস্কার পাচ্ছেন, যদিও তাঁদের সংখ্যা এখনো খুবই কম।’
নতুন প্রযুক্তি কীভাবে বাজার ও সরকারি নীতিকে রূপান্তরিত করে, তা নিয়ে গবেষণাকারী মার্কিন অর্থনীতিবিদ সুসান অ্যাথি এবার পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাজির বাজারে আলোচিত প্রার্থীদের একজন। কয়েক বছর ধরেই নোবেল পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছেন তিনি।
স্টকহোম স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক এবং নোবেল অর্থনীতি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান তোরে এলিংসেন বলেন, ‘লিঙ্গসমতা ও বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় আনা উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘গবেষণার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব এবং তার ব্যবহারিক তাৎপর্যই নির্ধারক।’
চলতি নোবেল মৌসুমে এ পর্যন্ত দুজন নারী পুরস্কার পেয়েছেন—শুক্রবার শান্তিতে নাভি পিল্লাই এবং সাহিত্যে কানাডীয়-আইসল্যান্ডীয় লেখক অ্যান কারসন।
রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান এবং জাপানের কেনসো সোয়াই। পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামের ফ্রান্সিস হালজেন।
আর সবার আগে ঘোষিত চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডেইসেরথ এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল।









