মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে ইলেকট্রনিক পণ্যের অপরিহার্য অংশ সার্কিট বোর্ডের কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে স্মার্টফোন, কম্পিউটার থেকে শুরু করে এআই সার্ভারে ব্যবহৃত ‘প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড’ বা পিসিবি’র দাম বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা।
রয়টার্স লিখেছে, মেমোরি চিপের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে ইলেকট্রনিক্স নির্মাতারা আগে থেকেই হিমশিম খাচ্ছিল, এর ওপর এমন পরিস্থিতি তাদের জন্য নতুন ধাক্কা। এ অবস্থা ইরান যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাবকেই তুলে ধরছে, যা সাপ্লাই চেইন, প্লাস্টিক ও তেল সরবরাহে বিপর্যয় তৈরি করেছে।
এপ্রিলের শুরুতে সৌদি আরবের জুবাইল পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা চালায় ইরান। ফলে পিসিবি ল্যামিনেট তৈরির অন্যতম মূল উপাদান ‘হাই-পিউরিটি পলিফেনিলিন ইথার’ বা পিপিই রেজিনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ উন্নত মানের পিপিই সরবরাহ করে ‘সাবিক’ কোম্পানি। পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের জুবাইল কমপ্লেক্সে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর আর তারা উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। ফলে বিশ্বজুড়ে এ কাঁচামালের সংকট তীব্র হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এআই সার্ভারের ক্রমাগত চাহিদার কারণে গত বছরের শেষ দিক থেকেই পিসিবি’র দাম বাড়ছিল।
রয়টার্সকে দেওয়া তিন শিল্প বিশেষজ্ঞের তথ্য বলছে, মার্চ থেকে এ চাহিদা আরও তীব্র হয়েছে। কারণ নির্মাতারা কাঁচামাল নিশ্চিত করতে ও আকাশচুম্বী খরচের প্রভাব সামলাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর বিশ্লেষকরা বলেছেন, কেবল এপ্রিলেই পিসিবি’র দাম মার্চের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়লেও ক্লাউড সেবাদাতা কোম্পানিগুলো তা মেনে নিতে রাজি। কারণ তাদের হিসাব বলছে, আগামী বছরগুলোতে তাদের সেবার চাহিদা বাড়বে।
‘প্রিজমার্ক’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে পিসিবি শিল্পের বাজার ১২.৫ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। দক্ষিণ কোরিয়ার পিসিবি নির্মাতা কোম্পানি ‘ডেডাক ইলেকট্রনিক্স’ এর গ্রাহক তালিকায় রয়েছে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স, এসকে হাইনিক্স ও এএমডি’র মতো বড় কোম্পানি। ‘ডেডাক ইলেকট্রনিক্স’ এরইমধ্যে দাম বাড়ানোর বিষয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।
রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন কোম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, তার কাজের অগ্রাধিকার এখন বদলে গেছে। আগে তিনি গ্রাহকদের সঙ্গে বেশি সময় দিলেও এখন তাকে সরবরাহকারীদের পেছনে বেশি ছুটতে হচ্ছে। কারণ ‘এপোক্সি রেজিন’ এর মতো রাসায়নিক কাঁচামাল পাওয়ার জন্য আগে যেখানে কেবল তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হত এখন তা বেড়ে ১৫ সপ্তাহে দাঁড়িয়েছে।
পিসিবি’র দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ার পেছনে গ্লাস ফাইবার ও কপার ফয়েলের মতো অন্যান্য মূল উপাদানের সংকটও বড় ভূমিকা রাখছে। এ বছরের শুরু থেকে কপার ফয়েলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং মার্চ থেকে এ দাম বাড়ার গতি আরও দ্রুত হয়েছে।
এনভিডিয়া’র অন্যতম প্রধান চীনা পিসিবি সরবরাহকারী কোম্পানি ‘ভিক্টরি জায়ান্ট টেকনোলজি’ বলেছে, পিসিবি তৈরির মোট কাঁচামাল খরচের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় তামার পেছনে। এ মাসের শুরুতে ‘ভিক্টরি জায়ান্ট টেকনোলজি’ সতর্ক করে বলেছিল, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রেজিন ও তামার মতো প্রধান উপাদানের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ভিক্টরি জায়ান্টের তথ্য অনুসারে, মাল্টি-লেয়ার পিসিবি’র প্রতি বর্গমিটারের দাম বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩৯৪ ইউয়ান বা ২০৪ ডলার। তবে এআই সার্ভারে ব্যবহৃত উচ্চমানের বিভিন্ন মডেলের ক্ষেত্রে এ দাম প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১৩ হাজার ৪৭৫ ইউয়ান পর্যন্ত হতে পারে।
সূত্র:বিডি-প্রতিদিন









