যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। এরই মাঝে খারাগ দ্বীপে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে মার্কিন বাহিনী হামলা চালানোর পর সংঘাত আরও তীব্রতর হয়েছে। উল্লেখ্য, এই দ্বীপটি ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ইচ্ছা করে দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে আঘাত করেনি, তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয় তবে এই তেল স্থাপনাগুলোই হবে পরবর্তী লক্ষ্য। অন্যদিকে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় কোনো হামলা হলে তারা পুরো অঞ্চল জুড়ে মার্কিন সংশ্লিষ্ট তেল অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হানবে।
ইরান পরিস্থিতি
যৌথ হামলা: ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা লেবাননের হিজবুল্লাহর সাথে সমন্বয় করে ইসরায়েলে একযোগে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানাতে তাদের বার্ষিক ‘আল-কুদস দিবস’-এর অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ‘আহত’: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা জানি তথাকথিত এই নতুন নেতা আহত এবং সম্ভবত তার চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে।”
১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার: মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট মোজতবা খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের তথ্যের জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
খারাগ দ্বীপে মার্কিন হামলা: ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে মার্কিন বাহিনী খারাগ দ্বীপে ইরানের সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে। তিনি এই দ্বীপটিকে ইরানের ‘মুকুট মণি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।
হতাহতের সংখ্যা: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১,৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮,৫৫১ জন আহত হয়েছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিস্থিতি
ইরানের পাল্টা আঘাত: ইরান পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
সৌদি আরবে ড্রোন প্রতিহত: সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, তারা দেশের পূর্বাঞ্চলে পাঁচটি এবং ‘এম্পটি কোয়ার্টার’ মরুভূমি অঞ্চলে একটিসহ মোট ছয়টি ড্রোন ধ্বংস করেছে।
কাতার: কাতারি সশস্ত্র বাহিনী সফলভাবে একটি আগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। হামলার আগে নাগরিকদের মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কতা সংকেত পাঠানো হয় এবং এডুকেশন সিটিসহ কিছু এলাকা সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বাহরাইন: দেশটিতে সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের শান্ত থেকে নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ওমান: ড্রোন পড়ে ওমানে দুজন নিহত হওয়ার পর ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক এবং কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
এফ-ওয়ান (F1) রেস বাতিল: যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাহরাইন এবং সৌদি আরবে অনুষ্ঠিতব্য ফর্মুলা ওয়ান রেস বাতিল বা পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
বিশাল সামরিক মোতায়েন: ইরানি ড্রোন হামলা মোকাবিলায় মার্কিন সেনাবাহিনী ১০,০০০ ইন্টারসেপ্টর ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। এছাড়া ২,৫০০ মেরিন সেনাসহ উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছেন হেগসেথ।
আক্রমণাত্মক বক্তব্য: প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী শত্রুদের জন্য “কোনো ক্ষমা বা দয়া দেখাবে না”। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তেল অবকাঠামো রক্ষা: খারাগ দ্বীপের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করলেও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি “ভদ্রতার খাতিরে” তেল স্থাপনাগুলোতে হাত দেননি। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সমস্যা হলে তিনি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন বলে আল্টিমেটাম দিয়েছেন।
ইসরায়েল পরিস্থিতি
৭,৬০০ লক্ষ্যবস্তু: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা ইরানে প্রায় ৭,৬০০টি এবং লেবাননে ১,১০০টি হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলে আঘাত: ইরান থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণের পর ইসরায়েলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র তেল আবিবের দুটি স্থান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
লেবানন পরিস্থিতি
নিহতের সংখ্যা বাড়ছে: ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৭৩ জন নিহত হয়েছেন।
চিকিৎসাকর্মীদের ওপর হামলা: বুর্জ কালাউইয়াহ এলাকায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলায় ১২ জন চিকিৎসাকর্মী (ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিক) নিহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের ঘাঁটিতে আঘাত: দক্ষিণ লেবাননের মেস আল-জাবাল শহরে নেপালি শান্তিরক্ষী বাহিনীর (UNIFIL) সদর দপ্তরে ইসরায়েলি গোলা আঘাত হেনেছে।
হিজবুল্লাহর অবস্থান: হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম জানিয়েছেন, তার দল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে “দীর্ঘ লড়াইয়ের” জন্য প্রস্তুত।
ইরাক পরিস্থিতি
মার্কিন দূতাবাসে হামলা: বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের হেলিপ্যাডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। আল জাজিরাকে জানানো হয়েছে, এই হামলায় দূতাবাসের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
তুরস্কের সতর্কতা: ইরাক ক্রমশ যুদ্ধের প্রভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় তুরস্ক তার নাগরিকদের দেশটিতে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
বিশ্ব জ্বালানি সংকট: যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় কানাডা ২৩.৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বিমান ভাড়া বৃদ্ধি: জ্বালানি খরচ বাড়ায় এয়ার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিগোসহ ভারতের বড় এয়ারলাইনগুলো টিকিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
কূটনৈতিক পরিবর্তন: বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় ভারত, ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনকে এড়িয়ে সরাসরি ইরানের সাথে যোগাযোগ করছে যাতে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাব হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা









