রবিবার । অক্টোবর ১১, ২০২৬

Image Not Found
ব্রেকিং নিউজ

‘বিএনপি’- কেন এই নাম, কেন এই দল?

Image

বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টিকে সংক্ষেপে বলে ‘বিএনপি’। বাংলায় ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’। বিএনপি, নামটির ভেতরে একটি ঐতিহাসিক সংস্কৃতি, দর্শন ও আদর্শিক অবস্থান জড়িয়ে আছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠা করেন, যার নামকরণে প্রতিটি শব্দ ছিল সচেতনভাবে নির্বাচিত। ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এই দলের পরিচয় একটি ভূখ-ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে ‘বাংলাদেশ’ মানে শুধু একটি জাতিগোষ্ঠী নয়, বরং একটি ভূখ-, একটি বহুজাতিক, বহুধারায় গঠিত রাষ্ট্র যার মধ্যে আছে বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতালসহ বহু জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য।

নামটির দ্বিতীয় অংশ, ‘জাতীয়তাবাদী’, আরও একটি দার্শনিক ভিত্তি প্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসন, দমননীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ যেখানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কে একমাত্র জাতীয় পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল, সেখানে জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নামে এক বিকল্প ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা সামনে আনেন। এটি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ থেকে সরে এসে আরো সমৃদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা রাজনৈতিক কাঠামোয় যুক্ত হয়, যা ভৌগোলিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে, দেশের সকল জনগোষ্ঠীর অধিকার, ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। অর্থাৎ, এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিস্থাপন করে। সর্বশেষে ‘দল’ শব্দটি এই চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দেওয়ার সংকেত দেয়। এটি শুধু মতাদর্শ নয়, বরং সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। ফলে পুরো নাম ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নাম নয়, বরং একটি আদর্শিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শনের রাজনৈতিক ঘোষণা, যা জাতি, রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত ও নির্মাণ করে।

১৯৭৬ সালের জুলাইয়ে জিয়াউর রহমান ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ রেগুলেশন (পিপিআর)’ ঘোষণা করেন, যার মাধ্যমে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় স্বনামে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। এতে আওয়ামী লীগসহ ৫৬টি দল আবেদন করে, যার মধ্যে ২৩টি দলকে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু কেউই বাকশাল পুনরুজ্জীবনের দাবি তোলে নাÑ এমনকি আওয়ামী লীগও। এই নীরবতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জনগণের মতো রাজনৈতিক নেতারাও একদলীয় শাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। অথচ ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব নিজেই আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাকশাল চালু করেছিলেন। প্রশ্ন ওঠে যদি বাকশালই ভবিষ্যতের পথ হতো, তবে আওয়ামী লীগ তা ফিরিয়ে আনেনি কেন? উত্তর স্পষ্টÑ বাকশাল ছিল গণতন্ত্রবিরোধী, আর জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মত-পথের বৈচিত্র্য ও জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। এই অন্তর্ভুক্তি রাষ্ট্রচিন্তার ধারাবাহিক প্রকাশ ঘটে ১৯ দফা কর্মসূচিতে, যা ১৯৭৭ সালের ২৮ মে, জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন। তখন বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটে জর্জরিত। এই কর্মসূচি কেবল শাসনব্যবস্থার রূপরেখা নয়; বরং এটি ছিল এক নতুন রাষ্ট্রদর্শনের ঘোষণাপত্র, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আদর্শিক ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯ দফা কর্মসূচিই বিএনপি গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক ও দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, কেবল ব্যক্তি নির্ভর রাজনৈতিক উদ্যোগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও জাতীয় লক্ষ্যের ভিত্তিতে দল গঠিত হওয়া উচিত। তাই ১৯ দফার মাধ্যমে যে জাতীয়তাবাদী, আত্মনির্ভরশীল, গণমুখী ও ধর্ম-সংস্কৃতিভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা তুলে ধরা হয়, সেটিই পরবর্তীতে বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের মূল চেতনায় পরিণত হয়। এই কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ধারণা, যা ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাসভিত্তিক নাগরিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতিসত্তার রূপরেখা দেয়। এটি পূর্ববর্তী বিভাজনমূলক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। ১৯ দফায় জিয়াউর রহমান গুরুত্ব দেন গ্রামীণ উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, শিক্ষা সংস্কার, প্রশাসনের জবাবদিহিতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর। এই দিকনির্দেশনাগুলো বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচনী ইশতেহার ও সাংগঠনিক কাঠামোয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘জনতার সরকার’ ও ‘মাটি ও মানুষের রাজনীতি’ ছিল এই দর্শনের বাস্তবায়ন। ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল, এক ধরনের রাজনৈতিক রেনেসাঁ স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে একটি উদারপন্থী, গণমুখী ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার প্রয়াস। এটি কেবল ক্ষমতা চর্চার ভিত্তি নয়; বরং গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের এক বিকল্প পথরেখা।

সার্বিকভাবে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ছিল একটি সময়োপযোগী, বাস্তবমুখী ও ভবিষ্যতমুখী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, যা তাঁকে একজন রাষ্ট্রদার্শনিক ও জনপ্রিয় জাতীয়নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিএনপির জন্ম এই কর্মসূচির আদর্শিক ধারাবাহিকতায় কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় আদর্শকে সংগঠিত রূপ দেয়ার প্রয়াস, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের সেই ঐতিহাসিক ১৯ দফার মধ্য দিয়ে। ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণার পর দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একটি নতুন কাঠামোয় রূপ দেয়ার প্রয়াস শুরু করেন তিনি। এই প্রক্রিয়ায় তিনি রাজনীতি ও প্রশাসনের কেন্দ্রে অসামরিক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির অংশগ্রহণ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেন। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ শামসুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ আলী আহসান এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো ব্যক্তিত্বদের তিনি উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেন।

জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে একটি সংগঠিত ও আদর্শনির্ভর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জরুরি। তাই তিনি একাধারে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত হন এবং নিজস্ব কাঠামো নির্মাণে সচেষ্ট থাকেন। এই প্রক্রিয়ায় তাঁর অন্যতম আলোচ্যসঙ্গী ছিলেন মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক উত্তরসূরি মশিউর রহমান যাদু মিয়া। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে যারা ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগ দিয়েছিল, তারা ১৯৭৬-৭৭-এর পর গণতন্ত্র ও বহু দলীয় রাজনীতির পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন। জিয়াউর রহমান এই পরিস্থিতিকে সতর্কভাবে মূল্যায়ন করেন। তিনি তাদের সবাইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেননি, বরং ছিলেন কৌশলী ও দূরদর্শী।

১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। দলটি প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় তিনি ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠন করেন, যার চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি নিজে এবং একনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। ৩ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জাগদলসহ ন্যাপ-ভাসানী, মুসলিম লীগ, ইউপিপি, লেবার পার্টি ও তফসিলি ফেডারেশন মিলিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ থেকে জিয়াউর রহমন প্রার্থী হন। অপরদিকে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ন্যাপ-মোজাফফর, সিপিবি, জাতীয় জনতা পার্টি, গণ-আজাদী লীগ ও পিপলস লীগ গঠন করে ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’, যাদের প্রার্থী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম. এ. জি. ওসমানী। নির্বাচনে জিয়া ৭৬.৬৩% ভোট পান, ওসমানী পান ২১.৭%, যা বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থন নির্দেশ করে। যদিও ফ্রন্টে বিভিন্ন মতের লোক ছিলেন, তাদের একমাত্র মিল ছিল আওয়ামী লীগ বিরোধিতা, যা জিয়াকে সন্তুষ্ট করেনি। তাই নিজের রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করতে তিনি আরও দৃঢ় রাজনৈতিক দল গঠনে মনোযোগ দেন। রাজনৈতিক দলের ভিত্তি গঠনে প্রেসিডেন্ট জিয়া ছিলেন ধৈর্যশীল ও বহুমুখী। কর্নেল অলি আহমদ মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক সংযোগে যুক্ত ছিলেন, আর ব্রিগেডিয়ার নুরুল ইসলাম শিশুর অফিস হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দল গঠনের আলাপ-আলোচনার কেন্দ্র। তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর প্রস্তাবিত ‘জাস্টিস পার্টি’ নামটিকে তিনি গ্রহণ করেননি এটি তাঁর কাছে জাতীয়তাবাদের বিস্তৃত ভাবধারাকে ধারণ করতে অসমর্থ মনে হয়েছিল।

অবশেষে, জিয়াউর রহমান নিজেই দলটির নাম ঠিক করেনÑ ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’। এখানে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ভূখ-ভিত্তিক পরিচয় এবং জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে সম্মান করে। ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর অন্তর্ভুক্তি দর্শনের প্রতীক, যা ঐতিহ্য, ইসলাম, ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে একসূত্রে গেঁথে রাষ্ট্রীয় দর্শন-আদর্শে রূপান্তর করে। আর ‘দল’ শব্দটি এটিকে একটি সংগঠিত, উদ্দেশ্যনির্ভর রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট জাগদল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর ১ সেপ্টেম্বর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোকে একত্রিত করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। গঠনতন্ত্র প্রণয়নে যাঁরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, মওদুদ আহমদ, ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং সর্বাগ্রে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এভাবেই, বিএনপি কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয় বরং তা হয়ে ওঠে একটি নতুন রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা ও জনগণের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার ধারক। এর গঠনপ্রক্রিয়া, নামকরণ ও আদর্শিক ভিত্তি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য ও প্রভাবশালী দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩১টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে এবং মোট ভোটের ৪৪ শতাংশ পায়। আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন ও ২৫ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি মূলত মাওলানা ভাসানী ও তাঁর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতীক ছিল, যেটি বিএনপি গঠনের পর গ্রহণ করা হয়। ধানের শীষ প্রতীকটি বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষক ও কৃষির গুরুত্বের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। জিয়াউর রহমান কৃষি ও গ্রামীণ মানুষের উন্নয়নে গভীর বিশ্বাসী ছিলেন এবং কৃষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ বিএনপির দলীয় সংগীত। আর ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দলীয় স্লোগান।

বিএনপির রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদভিত্তিক গণঐক্যের মাধ্যমে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, অখ-তা ও গণতন্ত্র রক্ষা। দলটি সা¤্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও বহিরাক্রমণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গ্রামীণ জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে বিশ্বাসী। রাজনৈতিক গোপন সংগঠন ও সশস্ত্র ক্যাডার গঠনের বিরোধিতা করে মানবিক মূল্যবোধ, পল্লী উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নারী ও যুবশক্তির সদ্ব্যবহার এবং বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমতা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে বিএনপি কাজ করে।

বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, মুক্তির সংগ্রাম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐক্যের ধারক। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের সমন্বয়ে বিএনপির দর্শন গঠিত হয়েছে, যেখানে গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বিএনপি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য হ্রাস এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বিএনপির আবির্ভাব ছিল জাতীয় আত্মসচেতনতার পুনর্জাগরণ, যা ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র ও জাতির ঐক্য পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা। বিএনপির অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির বিভেদ ভুলে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে চায়। রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মানুষের সার্বিক মুক্তির মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

লেখক : শেখ রফিক, গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক।

Releated Posts

দিল্লিজুড়ে ধরপাকড় চলছে, ককরোচ পার্টির অভিজিৎ দীপ আটক

দিল্লিজুড়ে ধরপাকড় চলছে, ককরোচ পার্টির অভিজিৎ দীপ আটক

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সামনে রেখে অভিযান চালিয়ে হাজারো ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ।…

অক্টোবর ১০, ২০২৬
সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরুর বিভাজন নয়, সমঅধিকারের পরিচয় হবে বাংলাদেশি: মাহদী আমিন

সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরুর বিভাজন নয়, সমঅধিকারের পরিচয় হবে বাংলাদেশি: মাহদী আমিন

✒️বাসস প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে…

অক্টোবর ১০, ২০২৬
ধ্রুব রাঠি পুলিশের হাতে আটক

ধ্রুব রাঠি পুলিশের হাতে আটক

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচির আগে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে তার গুরুগ্রামের বাসা থেকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার গুরুগ্রামের…

অক্টোবর ১০, ২০২৬
UN Tourism Affiliate Member CIFFT Appoints M.Z.I. Dalton Zahir as Ambassador for Asia

UN Tourism Affiliate Member CIFFT Appoints M.Z.I. Dalton Zahir as Ambassador for Asia

The International Committee of Tourism Film Festivals (CIFFT), an affiliate member of UN Tourism, announced the official appointment…

অক্টোবর ৮, ২০২৬
লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, শোবিজ তারকাসহ সকল গণমাধ্যকর্মীকে নিয়ে ২৮ নভেম্বর হাতিরঝিলে মিডিয়া রান ২০২৬

লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, শোবিজ তারকাসহ সকল গণমাধ্যকর্মীকে নিয়ে ২৮ নভেম্বর হাতিরঝিলে মিডিয়া রান ২০২৬

রান ফর ক্লিন এয়ার এ স্লোগান নিয়ে লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, শোবিজ তারকাসহ সকল গণমাধ্যকর্মীকে নিয়ে ২৮ নভেম্বর রাজধানীর…

অক্টোবর ৮, ২০২৬
আশুগঞ্জ ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশোধিত ট্যারিফ অনুমোদন

আশুগঞ্জ ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশোধিত ট্যারিফ অনুমোদন

আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) স্থাপিত ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য নির্ধারিত লেভেলাইজড…

অক্টোবর ৮, ২০২৬
পুঁজিবাজারের তারল্য বাড়াতে বিশেষ তহবিল ৩০০ কোটি করার দাবি

পুঁজিবাজারের তারল্য বাড়াতে বিশেষ তহবিল ৩০০ কোটি করার দাবি

দেশের পুঁজিবাজারে চলমান তারল্য সংকট মোকাবিলা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদারে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিল সুবিধার…

অক্টোবর ৮, ২০২৬
মেসির জায়গা কখনোই পূরণ হওয়ার নয় : এমেলি

মেসির জায়গা কখনোই পূরণ হওয়ার নয় : এমেলি

 বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে লিওনেল মেসির বিদায় যেন একটি অসাধারণ যুগের সমাপ্তি। বাংলাদেশেও তার…

অক্টোবর ৮, ২০২৬
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস আজ, চোখের যত্নে জনসচেতনতা বাড়ানোই দিবসটির মূল লক্ষ্য

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস আজ, চোখের যত্নে জনসচেতনতা বাড়ানোই দিবসটির মূল লক্ষ্য

আজ বিশ্ব দৃষ্টি দিবস। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। অন্ধত্ব ও দৃষ্টিশক্তি হারানোর…

অক্টোবর ৮, ২০২৬