২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলি বাহিনী সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। এই দুই বছরে গাজা উপত্যকার প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। নিহত হয়েছেন ৬৬ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি।ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেড ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের দক্ষিণ ইসরাইলে হামলার প্রতিক্রিয়ায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলি বাহিনী আক্রমণ শুরু করে।
গাজায় প্রতি ৩৩ জনের মধ্যে একজন নিহত
দুই বছরের ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ৬৭ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আরো হাজার হাজার মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। অর্থাৎ প্রতি ৩৩ জনের মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন। যা যুদ্ধ-পূর্ব জনসংখ্যার তিন শতাংশ।
নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ হাজার শিশু রয়েছে। অর্থাৎ গত ২৪ মাসে প্রতি ঘণ্টায় একজন শিশু নিহত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালে আনা বা আনুষ্ঠানিক রেকর্ডের উপর ভিত্তি করে নিহতের সংখ্যা গণনা করে। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি অজানা এবং সম্ভবত অনেক বেশি। কারণ সরকারি পরিসংখ্যানে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড় থাকা বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রতি ১৪ জনের মধ্যে একজন আহত
গাজায় দুই বছরের যুদ্ধে আহতদর সংখ্যা আরো বেশি। এক লাখ ৬৯ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, গাজায় তিন থেকে চার হাজার শিশু এক বা একাধিক অঙ্গ হারিয়েছে। অবরুদ্ধ গাজাজুড়ে এখনো যে কয়েকটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র খোলা আছে, সেগুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এবং অ্যানেস্থেসিয়া না থাকায় রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
১২৫টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
ইসরাইল গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে আক্রমণ করেছে। গত দুই বছরে ৩৪টি হাসপাতালসহ কমপক্ষে ১২৫টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে ইসরাইলি হামলা ও গাজায় অব্যাহত বোমাবর্ষণের ফলে কমপক্ষে এক হাজার ৭২২ জন স্বাস্থ্য ও সাহায্যকর্মী নিহত হয়েছেন। আরো শত শত মানুষকে হাসপাতালের ওয়ার্ড ও রোগীর বিছানা থেকে জোর ধরে নিয়ে ইসরাইলি কারাগার ও সামরিক শিবিরে আটক রাখা হয়েছে।
হেলথ কেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়াচের মতে, ২২ জুলাই পর্যন্ত, ইসরাইলি বাহিনী ২৮ জন চিকিৎসককে আটক করেছে। এর মধ্যে ১৮ জন সার্জারি, অ্যানেস্থেসিওলজি, নিবিড় পরিচর্যা এবং শিশু বিশেষজ্ঞের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সিনিয়র বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এর মধ্যে দুই সিনিয়র চিকিৎসক ইসরাইলি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। তাদের লাশ এখনো আটকে রাখা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৭৯০টিরও বেশি ইসরাইলি আক্রমণ নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও অ্যাম্বুলেন্সে বোমা হামলাও রয়েছে।
দুর্ভিক্ষ
ইসরাইলের কঠোর অবরোধের কারণে গাজায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। সামরিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে ইসরাইল গত কয়েক মাস ধরে গাজায় সাহায্য প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই খাবার সংগ্রহ করার সময় ফিলিস্তিনিদের গুলি করা হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জিএইচএফ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে থেকে ত্রাণ সংগ্রহের চেষ্টার সময় ইসরাইলি সৈন্য ও জিএইচএফ নিরাপত্তা ঠিকাদারদের গুলিতে দুই হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১৯ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছেন।
১৫৪ শিশুসহ কমপক্ষে ৪৫৯ জন অনাহারে মারা গেছেন। ২২ আগস্ট জাতিসঙ্ঘ-সমর্থিত বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) সিস্টেম গাজায় দুর্ভিক্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
আইপিসির মতে, গাজায় বর্তমানে দুর্ভিক্ষ চলছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দেইর আল-বালাহ এবং খান ইউনিনে এটি বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধুমাত্র জুলাই মাসেই ১২ হাজরেরও বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার হয়েছে। যা বছরের শুরুর তুলনায় ছয় গুণ বেশি। প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজন শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে এবং প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন শিশু নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নেয় অথবা তার ওজন কম থাকে।
গাজার ৮৯ শতাংশ পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে গাজার ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত পানির অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে- কূপ, পাইপলাইন, লবণাক্তকরণ কেন্দ্র ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় আঘাত হেনেছে।
জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার ৮৯ শতাংশ পানি ও স্যানিটেশন নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। যার ফলে ৯৬ শতাংশেরও বেশি পরিবার ঝুঁকিতে পড়েছে।
প্রায় সব বাড়িই ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
গত দুই বছরের যুদ্ধে গাজা উপত্যকার প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসঙ্ঘের মানবিক-বিষয়ক সমন্বয় অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসের মধ্যে ৯২ শতাংশ আবাসিক ভবন এবং ৮৮ শতাংশ বাণিজ্যিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত এবং আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের ইউএনওএসএটি প্রোগ্রামের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত গাজাজুড়ে সব কাঠামোর প্রায় ৭৮ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
৬২ শতাংশ বাসিন্দার সম্পত্তির মালিকানা প্রমাণের জন্য আইনি কাগজপত্র না থাকায়, পুনর্নির্মাণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। অনেক পরিবার স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনার মুখোমুখি হবে। পুনর্নির্মাণ শুরু হলেও তারা তাদের বাড়িঘর বা জমি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন না।
শিক্ষাব্যবস্থা
যুদ্ধের কারণে গাজার শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শ্রেণীকক্ষ ও ক্যাম্পাস ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় প্রায় ছয় লাখ ৫৮ হাজার স্কুলের শিক্ষার্থী এবং ৮৭ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
শিক্ষাখাতের কমপক্ষে ৭৮০ জন কর্মী নিহত হয়েছেন এবং ৯২ শতাংশ স্কুলের এখন সম্পূর্ণ পুনর্গঠন প্রয়োজন। ৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয় ভবনসহ দুই হাজার ৩০০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনো স্থায়ী ভবনগুলো বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইসরাইলি কারাগারে বন্দী হাজারো ফিলিস্তিনি
১০ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বর্তমানে ইসরাইলি কারাগারে বন্দী রয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫০ শিশু ও ৮৭ জন নারী রয়েছেন। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো একে গুরুতর ও অমানবিক পরিস্থিতি বলে বর্ণনা করেছে।
গাজায় অথবা অধিকৃত পশ্চিমতীরে অভিযানের সময় তাদের আটক করা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে কোনো বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। কমপক্ষে তিন হাজার ৬২৯ জন ফিলিস্তিনিকে প্রশাসনিক কারাগারে আটক রাখা হয়েছে।
সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক জায়গা
শিরিন আবু আকলেহ অবজারভেটরি অনুসারে, ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় প্রায় ৩০০ সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আল জাজিরার ১০ জনও রয়েছেন।
বিদেশী গণমাধ্যমের গাজায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসরাইলি সৈন্যদের সাথে থাকা মাত্র কয়েকজন সাংবাদিককে গাজায় কঠোর ইসরাইলি সামরিক সেন্সরশিপের অধীনে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের মতপ্রকাশ ও মতামতের স্বাধীনতা-বিষয়ক বিশেষ দূত আইরিন খান বলেছেন, ইসরাইলের এই অভিযান ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের নীরব করার প্রচেষ্টার শামিল।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটি কস্টস অফ ওয়ার প্রজেক্টের প্রতিবেদন অনুসারে, মার্কিন গৃহযুদ্ধ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়ান ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ, যুগোস্লাভ সংঘাত এবং ৯/১১-পরবর্তী আফগানিস্তানের যুদ্ধের সময় যত সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, তার চেয়েও বেশি সাংবাদিক গাজায় নিহত হয়েছেন।-আল জাজিরা









