বাংলাদেশের নবম উইকেটের পতন হলো যখন, তখনও প্রয়োজন ১৬ বলে ৩০ রান। পাকিস্তানের জয় মনে হচ্ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে এক ওভারে তিন ছক্কায় হুট করেই বদলে গেল চিত্র। দুই পেসার আব্দুল গাফফার সাকলাইন ও রিপন মন্ডলের শেষ জুটির বীরত্বে ম্যাচ হলো ‘টাই’, লড়াই গড়াল সুপার ওভারে। সেখানে অবশ্য পেরে উঠল না বাংলাদেশ ‘এ’ দল।
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল রাইজিং স্টার্স টুর্নামেন্টের ফাইনালে বাংলাদেশকে সুপার ওভারে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাকিস্তান শাহিনস (এ দল)।
কাতারের দোহায় রোববার পেস-স্পিনের যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানকে ১২৫ রানে আটকে রাখে বাংলাদেশ। জবাবে একপর্যায়ে ৫৩ রানে ৭ ও ৯৬ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় আকবর আলির দল। সেখান থেকে ১০ ও ১১ নম্বর ব্যাটসম্যানের নৈপুণ্যে দুই দলের স্কোর হয় সমান। যদিও ১৯তম ওভারে ২০ রান তুললেও শেষ ওভারে ৭ রানের সমীকরণ মেলাতে পারেননি তারা।
মূল ম্যাচে ২ ছক্কায় ১২ বলে ১৬ রান করা সাকলাইনকে সুপার ওভারে নামানো হয় হাবিবুর রহমান সোহানের সঙ্গে। আহমেদ দানিয়েলের প্রথম বলে সোহানের সিঙ্গলের পর ফিরতি ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন সাকলাইন। পরের ডেলিভারিতে ওয়াইড ও বাই থেকে বাউন্ডারি মিলিয়ে বাংলাদেশ পেয়ে যায় ৫ রান। কিন্তু তৃতীয় বলে জিসান আলম বোল্ড হলে ৬ রানেই থমকে যায় বাংলাদেশ।
সেমি-ফাইনালে সুপার ওভারে প্রথম দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে ভারতকে শূন্য রানে আটকে দেওয়া রিপন এবার দারুণ কিছু করতে পারেননি। তার প্রথম দুই বলে আসে দুই রান। তৃতীয় বল ফুল টস পেয়ে ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে চার মারেন সাদ মাসুদ। পরের বলে এক রান নিয়ে উল্লাসে ওঠে ওঠেন তিনি ও তার দল।
শেষটা হতাশার হলেও দোহার ওয়েস্ট এন্ড পার্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে বোলিং নিয়ে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। রিপনের প্রথম বল মিড অনের দিকে খেলে সিঙ্গেল নিতে ছোটেন ইয়াসির খান। খানিকটা সামনে দৌড়ে বল ধরে সরাসরি থ্রোয়ে তাকে রান আউট করে দেন সাকলাইন।
পরের ওভারে স্পিনিং অলরাউন্ডার এসএম মেহরবের প্রথম বল বুঝতে না পেরে বোল্ড হন মোহাম্মদ ফাইক। ২ রানে নেই ২ উইকেট।
পঞ্চম ওভারে আক্রমণে এসে প্রথম বলে শিকার ধরেন বাঁহাতি স্পিনার রকিবুল হাসানও। তিনি বোল্ড করে দেন ঘাজি ঘোরিকে।
দুটি চার ও একটি ছক্কা মেরে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেন মাজ সাদাকাত। ছক্কা হজমের পরের বলেই তাকে (১৮ বলে ২৩) বোল্ড করে প্রতিশোধ নেন জিসান আলম। এক ওভার পর বাংলাদেশ উইকেট পেতে পারত আরেকটি। সাকলাইনের বলে মিড অফে সহজ ক্যাচ ফেলেন জিসান।
জীবন পাওয়ার পর আর ৫ রানের বেশি যদিও করতে পারেননি মিনহাস (২৩ বলে ২৫)। নিজের পরের ওভারেই বোল্ড করে দেন সাকলাইন। অধিনায়ক ইরফান খানের ২২ বলে ৯ রানের নড়বড়ে ইনিংস থামিয়ে দ্বিতীয় শিকার ধরেন রকিবুল।
৭৫ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলে পাকিস্তান লড়াইয়ের পুঁজি গড়তে পারে মাসুদের ২৬ বলে ৩৮ রানের ইনিংসের সুবাদে।
শেষের আগের ওভারে মাত্র ২ রান দিয়ে ৩ উইকেট শিকার করেন রিপন। চার ওভারে ১৬ রানে ২ উইকেট নেন রকিবুল।
রান তাড়ায় দ্বিতীয় বলে উবাইদ শাহকে ছক্কা মেরে শুরু করেন সোহান। পরের ওভারে শাহিদ আজিজকে ছক্কায় ওড়ান জিসান।
মূলত স্পিনাররা বোলিংয়ে আসার পর দিক হারিয়ে ফেলার শুরু বাংলাদেশের। তৃতীয় ওভারে বাঁহাতি স্পিনার মিনহাসের বলে এলবিডব্লিউ হন জিসান।
পরের ওভারে লেগ স্পিনার মাসুদের প্রথম পাঁচ বলে একটি ছক্কা ও দুটি চার মারেন সোহান। শেষ বল পুল করে সহজ ক্যাচ দেন আগ্রাসী ওপেনার (১৭ বলে ২৬)।
মিনহাসের পরের বলে রিভার্স সুইপের চেষ্টায় এলবিডব্লিউ হন মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন। বাঁহাতি স্পিনার সুফিয়ান মুকিমের বল ব্যাটে লেগে বোল্ড হন অধিনায়ক আকবর।
ভারতের বিপক্ষে সুপার ওভারে ছক্কার চেষ্টায় আউট হয়ে সমালোচনার মুখে পড়া ইয়াসির আলি এবার আউট হন বাজে শটে। বাঁহাতি স্পিনার সাদাকাতকে বেরিয়ে এসে খেলে কাভারে ক্যাচ দেন তিনি।
জাওয়াদ আবরারের জায়গায় সুযোগ পাওয়া মাহফুজুর রহমান ৩ রানে বোল্ড হন মুকিমের গুগলি বুঝতে না পেরে। এক বল পর আরেকটি গুগলিতে বোল্ড মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরি।
এই দুজনই আসরে প্রথমবার খেলার সুযোগ পান ফাইনাল দিয়ে। জাওয়াদকে বাদ দেওয়া ও আবু হায়দার রনির জায়গায় মৃত্যুঞ্জয়কে একাদশে নেওয়াটা ছিল যেমন বিস্ময়কর, তেমনি প্রশ্নবিদ্ধও। এই পেস বোলিং অলরাউন্ডারকে যে বোলিংই দেওয়া হয়নি!
তখন পর্যন্ত সোহান ছাড়া আর কেউ দুই অঙ্কে যেতে পারেননি। ৫৩ রানে ৭ উইকেটের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করেন এসএম মেহরব ও রকিবুল। ৩৭ রানের জুটি গড়েন দুজন।
দানিয়েলের শর্ট বলে ক্যাচ দিয়ে মেহরব বিদায় নেন ১৯ রান করে। দানিয়েলের পরের ওভারে আউট হয়ে যান রকিবুলও (২১ বলে ২৪)।
শেষ ২ ওভারে প্রয়োজন ছিল ২৭ রান। ১৯তম ওভারে আজিজকে দুটি ছক্কা মারেন সাকলাইন, একটি রিপন। এই ওভারে আসে ২০ রান।
শেষ ওভারে ৭ রানের সমীকরণে প্রথম বলে দুই রান নেন রিপন। পরের দুই বলে আসে দুটি সিঙ্গল। চতুর্থ বল ব্যাটে ছোঁয়াতে পারেননি রিপন। পরের বলেও একই পরিণতি, তবে বাই থেকে আসে এক রান। শেষ বলে আবার বাই থেকে এক রান ও ম্যাচ টাই।
ভারতের বিপক্ষে সুপার ওভারে জিতলেও, এখানে আর পারল না বাংলাদেশ। উল্লাসে মাতল পাকিস্তান।
এসিসি ইমার্জিং টিমস এশিয়া কাপ নাম পরিবর্তন করে এবার হলো এই রাইজিং স্টার্স টুর্নামেন্ট। সব মিলিয়ে এখানে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হলো পাকিস্তান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
পাকিস্তান ‘এ’: ২০ ওভারে ১২৫ (ইয়াসির ০, সাদাকাত ২৩, ফায়েক ০, ঘাজি ৯, মিনহাস ২৫, ইরফান ৯, মাসুদ ৩৮, আজিজ ৯, দানিয়েল ২, উবাইদ ০, মুকিম ৪*; রিপন ৪-০-২৫-৩, মেহরব ৪-০-২৮-১, রকিবুল ৪-০-১৬-২, জিসান ১-০-৯-১, সাকলাইন ৪-০-২৭-১, মাহফুজুর ৩-০-১৭-০)
বাংলাদেশ ‘এ’: ২০ ওভারে ১২৫/৯ (সোহান ২৬, জিসান ৬, মাহিদুল ০, ইয়াসির ৮, আকবর ২, মেহরব ১৯, মাহফুজুর ৩, মৃত্যুঞ্জয় ০, রকিবুল ২৪, সাকলাইন ১৬, রিপন ১১; উবাইদ ১-০-৭-০, আজিজ ৪-০-৪৭-০, মিনহাস ২-০-৫-২, মাসুদ ৩-০-৩৩-১, সাদাকাত ২-০-৭-১, মুকিম ৪-০-১১-৩, দানিয়েল ৪-০-১১-২)
ফল: ম্যাচ টাই, সুপার ওভারে জিতে চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ‘এ’
ম্যান অব দা ম্যাচ: আহমেদ দানিয়েল
ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট: মাজ সাদাকাত









