শনিবার । মে ২, ২০২৬

Image Not Found
ব্রেকিং নিউজ
  • Home
  • রিসার্চ
  • ৭ মার্চের কারাবাস: একটি রাত, একটি রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার দীর্ঘ ভূরাজনীতি

৭ মার্চের কারাবাস: একটি রাত, একটি রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার দীর্ঘ ভূরাজনীতি

Image

 ✒️মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু তারিখ আছে যে তারিখগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের সংখ্যা নয়। বরং রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্রে স্থায়ীভাবে লেখা একেকটা অধ্যায়। ৭ মার্চ ঠিক তেমনই একটি দিন। ইতিহাসের অদ্ভুত কাকতাল-এই একই তারিখে একদিকে জাতির মুক্তির ভাষণ স্মরণ করা হয়, অন্যদিকে ২০০৭ সালের সেই গভীর রাতে ধানমন্ডি বা পুরান ঢাকার কোনো গলিতে নয়, বরং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল জনাব তারেক রহমানকে।

সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, যৌথবাহিনীর একটি দল সেই রাতে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ ১৮ মাসের বা ৫৫৪ দিনের কারাবাস, রিমান্ড, মামলা আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এক অধ্যায়।

আমি কখনোই রাজনীতিকে সরল গল্প বলে মনে করি না। রাজনীতি আসলে ক্ষমতার ভূগোল। সেখানে জেলখানা, আদালত, নির্বাসন-সবই একেকটি কৌশলগত যন্ত্র। ২০০৭ সালের ঘটনাটিও সেভাবেই দেখতে হয়। তখনকার বাংলাদেশ ছিল একটি অদ্ভুত পরীক্ষাগার। ওয়াশিংটন, দিল্লি, বেইজিং-সবাই দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; সেটি ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথ, গার্মেন্টস সাপ্লাই চেইন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই ২০০৭ সালে যখন জরুরি অবস্থা জারি হলো, তখন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে ছিল এক ধরনের পরীক্ষার দৃষ্টিতে।

ওই সময়ের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতার ভিত কত গভীর ছিল। ২০০৬-৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬.৪ শতাংশ, কিন্তু একই সময় বিনিয়োগের প্রবাহ হঠাৎ করে কমে যায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০০৭ সালে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়।

তৈরি পোশাক রপ্তানি যদিও চলছিল, তবু দেশের ভেতরে একটি অদ্ভুত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন করছিল-বাংলাদেশ কি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে? এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের গ্রেপ্তারকে কেবল একটি আইনি ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। সেটি ছিল ক্ষমতার বৃহৎ খেলার একটি চাল। ২০০৭ সালের সেই রাতের পরে তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হয়-সংখ্যাটা ছিল অন্তত ১৩টি। ধীরে ধীরে আদালতে জামিন মিললেও প্রায় দেড় বছর কারাগারে থাকতে হয় তাকে। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি সব মামলায় জামিন পান এবং ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ নির্বাসন।

একটি রাষ্ট্রের রাজনীতিতে নির্বাসন খুব অদ্ভুত ঘটনা। ইতিহাসে দেখলে দেখা যায়, চার্লস দ্য গল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডন থেকেই ফ্রান্সের রাজনীতি পরিচালনা করেছিলেন। আয়াতুল্লাহ খোমেনি প্যারিসে বসেই ইরানের বিপ্লবের পরিকল্পনা করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়াতেও এমন নজির আছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও প্রায় একই দৃশ্য তৈরি হয়। লন্ডনের একটি বাড়ি থেকে তিনি প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতি পরিচালনা করেছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সময়টা ছিল উত্তাল। ২০০৯ সালের পরে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার এবং পরবর্তী ১৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতি এক ধরনের একদলীয় আধিপত্যের মধ্যে আটকে পড়ে। এই সময়ের অর্থনৈতিক সূচকগুলো আবার এক ভিন্ন গল্প বলে।

আন্তর্জাতিক মহল তখন বাংলাদেশকে “উদীয়মান অর্থনীতি” বলে আখ্যা দিতে শুরু করে। কিন্তু সংখ্যার এই উজ্জ্বলতার নিচে অন্য একটি বাস্তবতাও ছিল। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ২০১৮ সালে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের পরে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের সংকট বাংলাদেশকেও আঘাত করে। তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি চলে আসে।

এই সময়েই রাজনৈতিক অস্থিরতা আবার তীব্র হয়। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বড় পরিবর্তন ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তখন লিখেছিল-বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সেই সময়ের একটি বড় ঘটনা ছিল তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসনের পর দেশে ফেরা।

এই প্রত্যাবর্তনের ভেতরে কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাগ্যের গল্প নেই। এর ভেতরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি কাজ করেছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে নিজের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে দেখে। চীন আবার বাংলাদেশকে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চোখে বাংলাদেশ হলো ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই ত্রিমুখী শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে একজন রাজনীতিকের উত্থান বা পতন কখনোই নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। ৭ মার্চের সেই কারাবাসকে তাই অনেকেই একটি রাজনৈতিক নাটকের সূচনা দৃশ্য হিসেবে দেখেন।

কারাগারের গল্পগুলো সব সময় খুব অমানবিক। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রথম দিকে তাকে সাধারণ বন্দির মতো মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদা দেওয়া হয়-বিছানা, টেবিল, চেয়ারসহ কিছু সুবিধা দেওয়া হয়।

এই ঘটনাগুলো শুনলে অনেকেই ভাবেন-এগুলো কি শুধুই আইনের প্রয়োগ? নাকি রাজনৈতিক শক্তির সংঘর্ষ? আমার অভিজ্ঞতা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এই দুইয়ের সীমানা প্রায়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

আজ যখন ৭ মার্চের কারাবন্দি দিবস স্মরণ করা হয়, তখন সেটি কেবল অতীতের একটি স্মৃতি নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি প্রতীক। কারাগার, নির্বাসন, প্রত্যাবর্তন-এই তিনটি ধাপ প্রায় সব বড় রাজনৈতিক নেতার জীবনেই কোনো না কোনোভাবে দেখা যায়।

তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও সেই গল্পটিই দেখা যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অনেক মামলায় আদালত পরে খালাস দিয়েছে বা স্থগিত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি মামলায় আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে রায় দিয়েছে। রাজনীতিতে এই ধরনের আইনি লড়াই আসলে বৃহত্তর ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ। কখনো আদালত সিদ্ধান্ত দেয়, কখনো ইতিহাস।

৭ মার্চ তাই কেবল একটি দিন নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়। আজ যে মানুষ কারাগারে, কাল সে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রেও থাকতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বড় নির্মম বিচারক। কারাগারের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসা নেতাদের কেউ কেউ রাষ্ট্র নির্মাণ করেন, কেউ আবার ইতিহাসের প্রান্তে হারিয়ে যান। বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়ে কোন গল্পটি লেখা হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি কথা নিশ্চিত: ২০০৭ সালের ৭ মার্চের সেই রাত এবং তারেক রহমানের কারাবাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক

Releated Posts

লিবিয়ার উপকূলে ১৭ জনের লাশ ও ৭ জনকে জীবিত উদ্ধার

লিবিয়ার উপকূলে ১৭ জনের লাশ ও ৭ জনকে জীবিত উদ্ধার

লিবিয়ার উপকূলে সাগরে ভাসমান একটি নৌযান থেকে ১৭ জনের লাশ ও আরও ৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। …

এপ্রিল ৩০, ২০২৬
ইরানকে ‘শিগগিরই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে’ পারমাণবিক চুক্তি মেনে নিতে হবে’ : ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

ইরানকে ‘শিগগিরই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে’ পারমাণবিক চুক্তি মেনে নিতে হবে’ : ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচিতে ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিতে তেহরানকে দ্রুত…

এপ্রিল ৩০, ২০২৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতে হত্যা ও গুমসহ ১,৮৫৫ মামলা দায়ের: আসাদুজ্জামান

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতে হত্যা ও গুমসহ ১,৮৫৫ মামলা দায়ের: আসাদুজ্জামান

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় জুলাই…

এপ্রিল ৩০, ২০২৬
বিমানের বহরে যুক্ত হচ্ছে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ : আজ সন্ধ্যায় চুক্তি সই

বিমানের বহরে যুক্ত হচ্ছে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ : আজ সন্ধ্যায় চুক্তি সই

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হচ্ছে আরও ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ। আধুনিককালে বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণের লক্ষ্যে…

এপ্রিল ৩০, ২০২৬
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাস নিশ্চিত করতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাস নিশ্চিত করতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে,…

এপ্রিল ৩০, ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের শুভেচ্ছা বিনিময়

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের শুভেচ্ছা বিনিময়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ। আজ সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন…

এপ্রিল ৩০, ২০২৬
প্রাইজবন্ডের ড্র আজ, প্রথম পুরস্কার ৬ লাখ টাকা

প্রাইজবন্ডের ড্র আজ, প্রথম পুরস্কার ৬ লাখ টাকা

১০০ টাকা মূল্যমানের বাংলাদেশ প্রাইজবন্ডের ১২৩তম ড্র আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রথম পুরস্কার বিজয়ীকে দেওয়া…

এপ্রিল ৩০, ২০২৬
বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে বরিশালে মাঝারি ও ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আজ বুধবার সকাল ১০ টার পর থেকে কখনো ভারি…

এপ্রিল ২৯, ২০২৬
সৌদিতে হজযাত্রী পৌঁছেছেন ৩৮২০৭ জন, মৃত্যু বেড়ে ৭

সৌদিতে হজযাত্রী পৌঁছেছেন ৩৮২০৭ জন, মৃত্যু বেড়ে ৭

এ বছর হজ পালন করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ৯৫টি ফ্লাইটে ৩৮ হাজার ২০৭ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে…

এপ্রিল ২৯, ২০২৬
৭ মার্চের কারাবাস: একটি রাত, একটি রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার দীর্ঘ ভূরাজনীতি - crd.news