দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে আনার জন্য পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর কারণ হিসেবে উত্তর কোরিয়া ইরানের বিরুদ্ধে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে দেশটির নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, সোমবার শুরু হওয়া এই মহড়াগুলো কেবল ব্যয়বহুলই নয়, বরং তা উত্তর কোরিয়ার কাছে ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও বৈরী বার্তা’ পাঠাবে। তার মতে, হোয়াইট হাউসে তার মেয়াদকালে উত্তর কোরিয়া কোনো হুমকি সৃষ্টি করেনি এবং শ্রদ্ধাশীল আচরণ করেছে।
ট্রাম্প লেখেন, যৌথ মহড়াটি বাতিল করার জন্য এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে যৌথ সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছি। প্রেসিডেন্ট আরও জানান, তিনি সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তারা ইরানের ‘পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ’ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেবে কি না। তারা বলেছিল, না, ধন্যবাদ।
এর আগে মে মাসে পেন্টাগনে এক বৈঠকে হেগসেথ দীর্ঘদিনের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার প্রশংসা করেছিলেন। তিনি দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এবং কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, এটি মিত্রদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার এমন একটি দৃষ্টান্ত যা আমেরিকার অন্য সব অংশীদারদের অনুসরণ করা উচিত।
যৌথ সামরিক মহড়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য
১৮,০০০ দক্ষিণ কোরীয় সেনার অংশগ্রহণে আয়োজিত ১১ দিনব্যাপী এই মহড়ার লক্ষ্য ছিল উত্তর কোরিয়ার হুমকির বিরুদ্ধে প্রস্তুতি জোরদার করা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গ্রীষ্মকালীন ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়াটি ‘আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে এই জোটের ভূমিকা’ সুদৃঢ় করে এবং নিজ নিজ দেশ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
বসন্তকালীন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এটি দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বার্ষিক দুটি প্রধান যৌথ মহড়ার মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, এই মহড়ায় জটিল পরিস্থিতিতে যৌথ অভিযানের অনুশীলন করার কথা ছিল। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল নিখুঁত লক্ষ্যভেদে যৌথ সক্ষমতা ও কৌশল যাচাইয়ের জন্য ‘লাইভ-ফায়ার’ অনুশীলন, জলপথ বা নদী অতিক্রমের কৌশল এবং আগে থেকে মোতায়েন রাখা সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রক্রিয়া।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবারই এই মহড়া শুরু হয়েছে।জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উত্তর কোরিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার কয়েক দিনের মধ্যেই এই যৌথ প্রশিক্ষণ শুরু হয়।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ও সাবেক নৌ-পাইলট মার্ক কেলি। প্রেসিডেন্টের পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এই যৌথ মহড়াগুলোকে দুর্বল করে ফেলাটা দূরদৃষ্টির অভাব এবং একটি ভুল পদক্ষেপ।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান উত্তর কোরিয়া থেকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করে। জুনের শেষের পর এটিই ছিল দেশটির প্রথম ব্যালিস্টিক অস্ত্র পরীক্ষার ঘটনা। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলের অদূরে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।
উত্তর কোরিয়ার কঠোর পদক্ষেপের হুমকি
২০১৯ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের উচ্চ-পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার সম্প্রসারণে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিম সম্ভবত মনে করেন অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার থাকলে ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি ছাড় আদায়ের সুযোগ বাড়বে।
শুক্রবার উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট নয় এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা এই সামরিক মহড়াকে ‘আক্রমণাত্মক যুদ্ধের মহড়া’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, এর ফলে অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বড় ধরনের সামরিক মহড়ার আগে উত্তর কোরিয়া প্রায়ই যে ধরনের কঠোর ভাষা ব্যবহার করে থাকে, এটি ছিল তেমনই একটি সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া প্রায়শই তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামরিক মহড়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা জোরদার করে এবং সেই সঙ্গে দেশটির অন্তর্মুখী নেতার প্রতি জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা চালায়।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য দেশটির নেতার সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছিলেন। পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প সেই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কিম জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে তার ভালো ব্যক্তিগত স্মৃতি রয়েছে। এছাড়াও তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার বিষয়ে তাদের ‘অবাস্তব ও ভ্রান্ত জেদ’ ত্যাগ করে, তবে তিনি আবারও আলোচনায় বসতে পারেন।
উত্তর কোরিয়ার কিমের পাশে দাঁড়িয়ে তোলা নিজের একটি ছবি পোস্ট করার ঠিক পরের দিনই ট্রাম্প এই ঘোষণাটি দেন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, ছবিতে যদিও তাদের বেশ রুক্ষ বা বন্ধুত্বপূর্ণ নয় এমন দেখাচ্ছে, তবে বাস্তবে দুই নেতার মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। সিঙ্গাপুরে কিমের সঙ্গে ২০১৮ সালের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, আমরা সামরিক মহড়া বন্ধ করলে প্রচুর অর্থ সাশ্রয় হবে। তবে শর্ত হলো, যদি না আমরা দেখি ভবিষ্যৎ আলোচনা কাঙ্ক্ষিত পথে এগোচ্ছে না।
সূত্র:অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।









