মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দাবি ছড়িয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নাকি আর মাত্র ১৪ দিনের তেল মজুত রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাত্র ১৪ দিনের তেল অবশিষ্ট রয়েছে- এমন দাবি বিভ্রান্তিকর।
মূলত দেশটির কৌশলগত তেল মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর)-এর বর্তমান মজুতকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দৈনিক তেল ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেই ‘১৪ দিন’ হিসাবটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এসপিআর যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল সরবরাহ নয়; এটি জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য রাখা একটি বিশেষ মজুদ।
কোথা থেকে এলো ‘১৪ দিনের’ হিসাব?
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এসপিআর মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মজুত প্রায় ২৮৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে। এ অবস্থায় কেউ কেউ এই মজুতকে যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের কাছাকাছি পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের সঙ্গে ভাগ করে প্রায় দুই সপ্তাহের সমপরিমাণ হিসাব করেছেন।
কিন্তু এই হিসাবের মধ্যেই রয়েছে মূল বিভ্রান্তি। এসপিআরের সব তেল প্রতিদিনের জাতীয় ব্যবহারের জন্য একসঙ্গে তুলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে রাখা হয়নি। এটি মূলত বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করার জন্য একটি জরুরি বাফার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই এসপিআরে যত ব্যারেল তেল আছে, সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দৈনিক জ্বালানি ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি ভাগ করে ‘দেশের হাতে এত দিনের তেল’ বলা বাস্তব পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে তুলে ধরে না।
এসপিআর আসলে কী?
স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ হলো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়ন্ত্রিত বিশাল জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুত। ১৯৭০-এর দশকে তেল সরবরাহ সংকটের পর ভবিষ্যৎ বড় ধরনের জ্বালানি বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য এটি গড়ে তোলা হয়।
টেক্সাস ও লুইজিয়ানার ভূগর্ভস্থ বিশাল সংরক্ষণাগারে এই তেল রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসপিআর থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৪ লাখ ব্যারেল তেল প্রতিদিন বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব। তবে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তেল বাজারে পৌঁছাতে প্রায় ১৩ দিন সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ এসপিআরের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের পুরো জ্বালানি চাহিদা দীর্ঘদিন মেটানো নয়। বরং বিদেশি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বা বড় ধরনের দুর্যোগে বাজারে তেলের প্রবাহ কমে গেলে সাময়িকভাবে ঘাটতি সামাল দেওয়া।
তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক?
এমনটাও বলা যাবে না। ‘১৪ দিনের তেল’ দাবি ভুল হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বাস্তব কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের অগ্রযাত্রায় বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পথই চাপের মুখে পড়েছে।
এর সঙ্গে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার ঘটনাও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ওই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। সাম্প্রতিক হামলার পর এর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
এসপিআর কেন এত কমেছে?
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন কারণে কমেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তেলের দাম ও সরবরাহ সংকট সামাল দিতে বড় পরিমাণে এসপিআর থেকে তেল ছাড়া হয়েছিল। ২০২৬ সালেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বড় আকারে মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন জ্বালানি দপ্তর জানিয়েছিল, প্রায় ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এসপিআর থেকে ছাড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচি প্রায় ১২০ দিন ধরে নির্ধারিত হারে তেল সরবরাহ করার কথা ছিল। ফলে জরুরি মজুতের পরিমাণ কমে গিয়ে বহু বছরের তুলনায় নিচের স্তরে চলে এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র শুধু এসপিআরের ওপর নির্ভরশীল নয়
‘১৪ দিনের’ দাবির আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেল উৎপাদন ও বাণিজ্যিক মজুতকে হিসাবের বাইরে রাখা হয়। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক। একই সঙ্গে দেশটির বেসরকারি খাতের হাতে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি মজুত থাকে। এগুলো এসপিআরের অংশ নয়, কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা EIA নিয়মিতভাবে বাণিজ্যিক তেল মজুত এবং এসপিআরের মজুত আলাদাভাবে হিসাব করে। ফলে এসপিআরের মজুত কমে যাওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় তেল সরবরাহ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে—এমন নয়।
আসল ঝুঁকি কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ মূলত অন্য জায়গায়। এসপিআরের মজুত যত কম থাকবে, বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বাজারকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল করার বাফার তত কম থাকবে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহপথগুলো যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত থাকে, তাহলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেই চাপ বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট এবং বাব আল-মানদেবে হুতিদের অগ্রযাত্রা বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি এখনো যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
১৪ দিনের দাবি কতটা সত্য?
সংক্ষেপে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাত্র ১৪ দিনের তেল আছে- এটি সঠিক নয়। ‘১৪ দিন’ মূলত এসপিআরের বর্তমান মজুতকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দৈনিক তেল ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করে পাওয়া একটি সরল হিসাব। কিন্তু এসপিআর দেশের একমাত্র তেল উৎস নয় এবং এর উদ্দেশ্যও প্রতিদিনের জাতীয় চাহিদা মেটানো নয়।
তবে এই ভাইরাল দাবির পেছনে একটি বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত আগের তুলনায় অনেক কম এবং একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহপথগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকার তেল ‘১৪ দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে’- এমন নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেল-নিরাপত্তার সক্ষমতা আগের তুলনায় বেশি চাপে পড়তে পারে।
তথ্য সূত্র- গালফ নিউজ।









