ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব কাটছে না বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধ শুরুর আট মাস পেরিয়ে গেলেও তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারদর স্বাভাবিক হয়নি। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ডিজেল, পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহ সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭২ থেকে ৭৩ ডলারের মধ্যে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৭ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন ব্রেন্টের দাম ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৭২ দশমিক ৪৮ ডলারে স্থির হয়েছিল। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ছিল ৬৭ দশমিক ০২ ডলার।
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (২ নভেম্বর) ব্রেন্টের দাম নেমে আসে ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ৮৪ ডলারে এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ছিল ১০২ দশমিক ৫৬ ডলার। সে হিসাবে যুদ্ধ শুরুর আগের শেষ কার্যদিবসের তুলনায় ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৯ দশমিক ৩৬ ডলার বা প্রায় ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
সংকট কেবল অপরিশোধিত তেলে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলের বাজারেও সরবরাহ ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। এসব পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে অপরিশোধিত তেলের চেয়ে দ্রুত বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত অক্টোবরের ‘অয়েল মার্কেট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরের পাইকারি বাজারে ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তা সর্বোচ্চ প্রায় ২২০ ডলারে পৌঁছেছিল। ওই রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা কমলেও ডিজেলের বেঞ্চমার্ক মূল্য এখনো অপরিশোধিত তেলের দামের প্রায় দ্বিগুণ।
৩০ অক্টোবরের সিঙ্গাপুর বাজারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১০ পিপিএম গ্যাসঅয়েল বা ডিজেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১৭০ দশমিক ০২ ডলার। একই দিনে গ্যাসোলিনের দাম ছিল ১২৭ দশমিক ৬৪ ডলার এবং জেট কেরোসিনের ১৬৮ দশমিক ৪২ ডলার। তবে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম সরাসরি তুলনা করা যায় না। শোধনাগারের সক্ষমতা, কাঁচামালের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও পরিশোধন মুনাফার ওপর পরিশোধিত পণ্যের দাম নির্ভর করে। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে তার প্রভাব পড়তে সময় লাগতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্ন
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহনে বিঘ্ন। যুদ্ধের আগে সমুদ্রপথে বিশ্বে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করত।
আইইএর জুলাইয়ের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহে বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে নজিরবিহীন সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। সংস্থাটি জানায়, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি পুনরুদ্ধার হচ্ছে ধীরগতিতে। সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে।
দাম কমলেও কাটেনি শঙ্কা
যুদ্ধের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার খবরে ২ নভেম্বর তেলের দাম কিছুটা কমেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ও কাতারের কর্মকর্তাদের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের আলোচনার খবর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এই দরপতনকে স্থায়ী স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলা ও তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এখনো ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) অক্টোবরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সরবরাহ সংকট ও বৈশ্বিক মজুত কমে আসায় ২০২৭ সালেও ডিজেলের বাজারে চাপ থাকতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের চাহিদা আগের বছরের তুলনায় কমতে পারে।
যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ওপর বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)









