ইউক্রেনকে সহায়তার লক্ষ্যে গঠিত নতুন বহুজাতিক সামরিক বাহিনীর প্রথম মহড়া চলতি মাসে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে ইউরোপের ১০টি দেশের প্রায় ২ হাজার ৮০০ সেনা অংশ নেবে। মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এ তথ্য জানিয়েছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে গঠিত এই বাহিনীর নাম ‘মাল্টিন্যাশনাল ফোর্স-ইউক্রেন’ (এমএনএফ-ইউ)। বাহিনীটির কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেই। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরই কেবল এটি ইউক্রেনে মোতায়েন করা হবে।
২০২৫ সালে গঠিত এই বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে প্যারিসে একটি সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়েছে। তবে এটি ন্যাটোর কোনো সামরিক অভিযান নয় এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাও খুব সীমিত।
বাহিনীটির মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করা, দেশটির আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষ্ণসাগরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালু করতে সহযোগিতা করা।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনা এখনো অগ্রসর না হওয়ায় এই মহড়ার সময়কাল ও ব্যাপকতা মস্কোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই মহড়ার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য বিভিন্ন দেশের স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনী কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে মোতায়েন করা সম্ভব, তা যাচাই করা হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, ‘এটি কোনো কাল্পনিক পরিকল্পনা নয়। এটি একটি বাস্তব সামরিক বাহিনী, যারা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত।’
তবে ‘কোয়ালিৎসজা’ (পোলিশ ভাষায় যার অর্থ ‘জোট’) নামের এই মহড়ার পরিধি ও সময়কাল রাশিয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। কারণ, যুদ্ধ বন্ধে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে মস্কোর এখনো তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
‘কোয়ালিৎসজা’ নামের এই মহড়া আগামী ৯ থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে পোল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নোভা ডেম্বা এলাকায় এর স্থল ও বিমানবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
মহড়ায় অংশ নিতে যাওয়া ১০টি দেশ হলো—বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ড, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য।
অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১০০ সেনা পাঠাবে ফ্রান্স। যুক্তরাজ্য পাঠাবে ৩০০ সেনা।
অন্যদিকে, কৃষ্ণসাগরে সম্ভাব্য মাইন অপসারণ কার্যক্রমের প্রস্তুতি যাচাই করতে তুরস্কের নেতৃত্বে ইস্তাম্বুল থেকে একটি পৃথক নৌ-মহড়ার আয়োজন করা হবে। তবে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত স্থল মহড়ায় তুরস্কের কোনো সেনা অংশ নেবেন না।
ফরাসি জেনারেল আর্মেল দিরু এবং যুক্তরাজ্যের লেফটেন্যান্ট জেনারেল টম বেটম্যান যৌথভাবে এই মহড়ার নেতৃত্ব দেবেন।
জেনারেল দিরু বলেন, বহুজাতিক বাহিনীর প্রথম এই মহড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাহিনীটি মোতায়েন করার সক্ষমতা বাস্তবে যাচাই করা যাবে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যজনিত সম্ভাব্য সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, মহড়ায় সেসব বিষয়ও পরীক্ষা করা হবে।
ভারী অস্ত্র নয়, ব্যবহার হবে হালকা সরঞ্জাম
মহড়ায় ভারী অস্ত্রের পরিবর্তে ড্রোনের মতো হালকা সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ড্রোন প্রতিরোধ এবং আত্মরক্ষার সক্ষমতা যাচাই করা হবে। এতে কোনো ট্যাংক মোতায়েন করা হবে না।
যুক্তরাজ্যের লেফটেন্যান্ট জেনারেল টম বেটম্যান স্পষ্ট করে বলেছেন, এই বাহিনী কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী নয় এবং যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করবে না।
তিনি বলেন, ‘এই বাহিনী আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়নি। এর উদ্দেশ্য হল ইউক্রেনকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে পুনর্গঠনে সহায়তা করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিরোধ এবং প্রয়োজন হলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো।’
বেটম্যান জানান, মহড়ায় বিভিন্ন দেশের বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর, রসদ সরবরাহ এবং সম্মিলিতভাবে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে।
এদিকে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বকেও ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধের পাঁচ বছর পূর্তির সময় ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সামরিক সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।
এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে সহায়তায় গঠিত বহুজাতিক বাহিনীর এই মহড়ার দিকে মস্কো সতর্ক নজর রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে জেনারেল দিরু বলেন, এই মহড়া কোনো শক্তি প্রদর্শনের আয়োজন নয়। তার ভাষায়, ‘এটি শক্তি প্রদর্শনের মহড়া নয়। আমরা সামরিক শক্তি জাহির করতে যাচ্ছি না।’








